সৌদি আরব-ইরান চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে কতটা প্রভাব পড়বে?

  বিশেষ প্রতিনিধি    13-03-2023    180
সৌদি আরব-ইরান চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে কতটা প্রভাব পড়বে?

সৌদি আরব ও ইরান সাত বছর আগে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে মুখোমুখি ও দ্বান্দ্বিক অবস্থান নেয়। সেই তিক্ততা পিছে ফেলে গত শুক্রবার চীনের মধ্যস্থতায় উভয় দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। চুক্তির প্রধান দিক হলো- দুই মাসের মধ্যে তারা একে অপরের রাজধানীতে দূতাবাস চালু করবে। পর্যবেক্ষক মহল চুক্তিটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণে এখনো অনেক পথ বাকি বলেও সতর্ক করছেন তারা।

রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন নতুন কিছু নয়। ইরানে ইসলামিক রেভ্যুলেশনের পরে নানা সময় সৌদি রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কের অম্ল -মধুর অধ্যায় ছিল। সর্বশেষ সাত বছর আগে সৌদি সরকার শীর্ষ শিয়া নেতাকে ফাঁসি দিলে ইরান তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সেই ঘটনার জেরে তেহরানের সৌদি দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জমে বরফ হয়ে পড়ে।

এদিকে গত শুক্রবারের চুক্তিতে মুনশিয়ানা দেখিয়েছে বেইজিং। সমঝোতা হওয়ার আগে টানা চার দিনের বৈঠক ছিল সম্পূর্ণ গোপন। আন্তর্জাতিক বিষয়াদির বিশ্লেষকরা দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে বসানোর বড় কৃতিত্ব দিতে চাইছে বেইজিংকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছেÑ এটি তেমন কিছু নয়; বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতে তেহরান আলোচনার টেবিলে বসেছে। কিন্তু এরপরও বেশ সতর্ক অবস্থান থেকে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরও দুই দেশ ইরাক ও ওমান চুক্তির ব্যাপারে বেশ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মোটা দাগে দেখলে এই সমঝোতা-চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন হবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা-বলয় মজবুত হবে। এর পাশাপাশি ইরানের রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘পরাজয়’ হিসেবে তুলে ধরেছে।

তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিয়াকো হোসেইনি বলেছেন, চুক্তিটি ইতিবাচক কিন্তু এটি অনেকগুলো ধাপের একটি ধাপ মাত্র। তার কথায়- সৌদি আরব হয়তো এখনো ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সতর্ক থাকবে; কেননা রিয়াদ কখনোই চাইবে না, মার্কিন নিষেধাজ্ঞ তাদের কাঁধে আসুক। তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তার হিসাবে অনুযায়ী- ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাকে চলমান উত্তেজনা হ্রাস করা এখন রিয়াদ ও তেহরান উভয় পক্ষের জন্যই সুবিধা।

হোসাইনি মনে করেন, চুক্তিতে বড় ধরনের জয়ী হয়েছে বেইজিং এমনকি এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের তৎপরতা সুবিধা হবে। শুধু তা-ই নয়, এর মধ্য দিয়ে বেইজিং ওয়াশিংটনের ঘাড়ের ওপর গরম নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পরিষ্কার বার্তা হলো যে, চীনকে আর বেশি দিন উপেক্ষা করা যাবে না। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চীনের অর্থনীতি বিস্তারের বিষয়টি তো আছেই।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক থমাস জুনাই মনে করেন, শুক্রবারের সমাঝোতা-চুক্তির মধ্য দিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তার যুক্তি হলো ইয়েমেনে দীর্ঘ যুদ্ধে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সৌদি আরব। এখন দেশটি এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা-চুক্তি রিয়াদকে পথ দেখাতে পারে। যদিও ইরানও হুতিদের সমর্থন করে আসছে।

একই সঙ্গে তিনি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে এখনই আশা করা ঠিক হবে না যে, নিকট-ভবিষ্যতে ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। এই বিষয়টি মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, হুতি ও সৌদি সমর্থিত জোটের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকবে এবং দক্ষিণ ইয়েমনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাবিও অব্যাহত থাকবে। তার যুক্তি হলো, হুতি-সৌদি সমঝোতা হলে চলমান সহিংসতা স্থানান্তরিত হবে কিন্তু থামবে না। অধ্যাপক জুনাউয়ের হিসাব অনুযায়ী ইরান ইয়েমেন খুব সামান্য ছাড় দিতে রাজি হবে কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে হুতিদের সমর্থন বন্ধ করতে রাজি হবে না।

রিয়াদ ও তেহরান সম্পর্ক ভবিষ্যতে কেমন হবে তা অনুমান করতে আমাদের অতীতে ফিরে তাকাতে হবে। ৮০র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে সৌদি রাজতন্ত্র ইরাককে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রিয়াদ-তেহরান ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। ইরানে প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ খাতেমির আমলে তেহরান-রিয়াদ ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালে একটি সহযোগিতামূলক চুক্তি ও ২০০১ সালে নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

গত শুক্রবারের চুক্তিতে ইরানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী শামখানি, যিনি ২০০১ সালে চুক্তির সময় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি সৌদি আরবের সর্বোচ্চ পুরস্কার আব্দুল আজিজ পদক লাভ করেন। প্রকৃতপক্ষে গত শুক্রবারের সমঝোতা-চুক্তির পেছনে তার জোরালো ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কাজেই চুক্তির ভিত বেশ পুরনো এটাও সহজেই অনুমেয়।

আন্তর্জাতিক-এর আরও খবর