রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষায় অন্য বন্ধুদের চেয়ে ‘আলাদা’ চীন

  বিশেষ প্রতিনিধি    01-12-2025    54
রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষায় অন্য বন্ধুদের চেয়ে ‘আলাদা’ চীন

বিগত ১৬ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতসহ বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে চীন। চীনের নেতা শি জিন পিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিসি) বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিতে বিশ্বাসী। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক বা আসুক না কেন, তার সঙ্গে কাজ করে এবং করতে চায় বেইজিং।

যদিও বাংলাদেশে চীনের এই নীতির সমালোচনা আছে। বিশেষ করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টি বেশ সমালোচিত হয়েছে। অপরদিকে, শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানাতেও চীন দেরি করেনি।

কূটনৈতিক অঙ্গন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পক্ষপাতের চেয়ে চীন বাংলাদেশে তার ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। সেজন্য চীন কোনো দলকে আলাদা গুরুত্ব না দিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়; অর্থাৎ সরকারে যারা থাকে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগটা বেশি করে থাকে। বাংলাদেশে চীনের কূটনীতি হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি চীন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও (ইইউ) একই কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশল এক্ষেত্রে ভিন্ন। চীন তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারলেই হলো। কে বা কোন দল ক্ষমতায় এল বা না এল সেটা তাদের কাছে বড় বিষয় নয়। ক্ষমতায় যে দলই আসুক, চীন তার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, চীনের বাংলাদেশে কূটনীতিটা হলো মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের। বাংলাদেশে তাদের অনেক প্রকল্প আছে। এখনো কিছু কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তেরি করার চেষ্টা করেছে, তেমনি আগামীর চিন্তাও তারা করছে। সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। ক্ষমতায় যে দলই আসুক, চীন স্বাগত জানাতে দ্বিধাবোধ করবে না।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শুরু থেকেই নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী ছিল বেইজিং। তবে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার কিছুদিন ‘ধীরে চলো নীতিতে’ ছিল। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে মরিয়া চীন অতি আগ্রহ নিয়ে সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিল। কিছুদিন পর দিল্লির সঙ্গে দূরত্বসহ নানা দিক বিবেচনা করে বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে সরকার।

বিএনপি-জামায়াতসহ সব দলের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সিরিজ বৈঠক চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে চীন যান। তার ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনে সরকারি সফরে যান। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি চীন এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

ঢাকার চীনা দূতাবাসের তথ্যমতে, রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মাসখানেক পরে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৫ আগস্ট (২০২৪) পরবর্তী সময়ে বিএনপি এবং জামায়াতের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের এটি ছিল প্রথম সাক্ষাৎ।

এই দুই সাক্ষাতের মধ্যে জামায়াতে আমিরের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে সেদিন আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। রাষ্ট্রদূত তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীকে একটি সুশৃঙ্খল দল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

চীনা দূতাবাসের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে একবার, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তিনবার এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেছেন।

অন্যদিকে, এই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে তিনি দুইবার সাক্ষাৎ করেছেন। এছাড়া, গাজীপুরে জামায়াতের আমিরের উপস্থিতিতে কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেন ইয়াও ওয়েন।

সারাদেশ-এর আরও খবর