৪৭ দিনের ‘আইসিইউ যুদ্ধ’, কাজ করেনি অ্যান্টিবায়োটিক!

  বিশেষ প্রতিনিধি    17-12-2025    43
৪৭ দিনের ‘আইসিইউ যুদ্ধ’, কাজ করেনি অ্যান্টিবায়োটিক!

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ৬৮ বছর বয়সী মো. সোনা মিয়া আকন্দ। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা এই কিডনি রোগী ভর্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হন। তাকে তৎক্ষণাৎ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় টানা ৪৭ দিনের আইসিইউ যুদ্ধ। দুটি বেসরকারি এবং পরে একটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২৫ নভেম্বর তিনি মারা যান।

মৃত ব্যক্তির ছেলে আবদুল্লাহ আল আলামিন জানান, প্রথম দিকে তার বাবার বড় ধরনের কোনো সংক্রমণ ছিল না। কিন্তু আইসিইউতে নেওয়ার পর থেকে প্রতিটি কালচার রিপোর্টেই দেখা যায়, শরীরে এমন জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছে, যার বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কার্যকর নয়। তিনি বলেন, “সব রিপোর্টেই একই কথা— নো সেনসিটিভ, নো ইন্টারমিডিয়েট; এভরিথিং রেজিস্ট্যান্স (সংবেদনশীল নয়, মধ্যবর্তী নয়; সবই প্রতিরোধী)।”

আইসিইউ সংক্রমণ, দাবি পরিবারের দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকা রোগীরা মাল্টি–ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (বহু-ওষুধ প্রতিরোধী) জীবাণুর মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকেন। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে পাওয়া জীবাণুগুলোর মধ্যে ৪১ শতাংশই কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকা অনেক রোগীই নতুন ও মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হন।

এমন বাস্তবতারই মুখোমুখি হয়েছেন আবদুল্লাহ আল আলামিন। শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তার বাবা মো. সোনা মিয়া আকন্দ ৪৭ দিন তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মারা যান। তার পরিবারের দাবি, আইসিইউতেই তিনি এমন সংক্রমণে আক্রান্ত হন, যার বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর ছিল না। আবদুল্লাহর ভাষায়, “আমার বাবা হাসপাতালে যাওয়ার সময় সংক্রমণ নিয়ে যাননি। আইসিইউতেই সংক্রমণ হয়েছে। সেখানে এমন জীবাণু পাওয়া গেছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ওষুধই কাজ করে না।” হাসপাতালের নিত্যদিনের চিত্র হাইজিন প্রটোকল ভঙ্গ

বাবার চিকিৎসার পুরো সময় কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন আবদুল্লাহ। তিনি দাবি করেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনেক ঘাটতি ছিল। তিনি বলেন, “অনেক সময় দেখা গেছে একই গ্লাভস দিয়ে নার্স একাধিক রোগী দেখছেন। আইসিইউতে রোগীর আত্মীয়রা মাস্ক বা গাউন ছাড়া প্রবেশ করেছেন। সংক্রামক রোগীদের আলাদা রাখার মতো কোনো জোনিং দেখতে পাইনি। এমনকি অনেক জায়গার পৃষ্ঠতলও নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা হয়নি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসবই আইসিইউ সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ। আবদুল্লাহও মনে করেন, তার বাবার মৃত্যু কোনো ‘ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য’ নয়— এটি সিস্টেমিক ব্যর্থতা। তার প্রশ্ন, “যদি আইসিইউ মানে হয় উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকি, ব্যয়, নিরাপত্তাহীনতা আর ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা; তাহলে আইসিইউর উদ্দেশ্য কী?”

তিনি মনে করেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে ইনফেকশন কন্ট্রোল জোরদার করা, নিয়মিত অডিট, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর নজরদারি, সংক্রমণের ঝুঁকি অনুযায়ী রোগীকে আলাদা রাখা এবং হাসপাতাল–সংক্রমণের ঘটনায় কঠোর জবাবদিহি চালু করা প্রয়োজন। বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউয়ের খরচ প্রতিদিন ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। সঙ্গে থাকে ওষুধপত্র, পরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ। আবদুল্লাহ আল আলামিন আরও জানান, সপ্তাহের শেষে কেবল ওষুধের বিলই অনেক সময় ২.৫ থেকে ৪.৫ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। তার ভাষায়, “জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে পরিবারগুলো মানসিক চাপের পাশাপাশি আর্থিকভাবে চরম সংকটে পড়ে।” রেজিস্ট্যান্সের ভয়াবহ চিত্র : ৪১% জীবাণু প্যান-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট

দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে শুধু আবদুল্লাহ আল আলামিন নয়, এমন অসংখ্য পরিবারই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নামক এক অচেনা যুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছেন। জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভিল্যান্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আইসিইউ থেকে সংগৃহীত নমুনার ৪১ শতাংশ সন্দেহভাজন প্যান-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (পিডিআর), অর্থাৎ পরীক্ষিত কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করেনি। সামগ্রিকভাবে হাসপাতালের নমুনায় বহু-ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর হার ৪৬ শতাংশ, আর আইসিইউতে তা ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

সারাদেশ-এর আরও খবর