নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা

  বিশেষ প্রতিনিধি    08-02-2026    33
নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল বলে তীব্র সমালোচনা আছে। ওই নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার সতর্ক অবস্থানে আছেন সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এবার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন তারা। এজন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ডিসিরা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটে জেলা প্রশাসকরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতীতে দেখা গেছে, জেলা প্রশাসকরা অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অতি উৎসাহী হয়ে একটা পক্ষ নিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে তারা কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন এবার বেশিরভাগ জেলা প্রশাসক নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করে নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করবেন।

বিতর্কিত অতীত : আওয়ামী লীগকে জেতাতে মরিয়া ছিল প্রশাসন

আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ওঠে নানা অভিযোগ। ওই তিন নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনাও হয়। সাজানো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বার বার নির্বাচিত করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তখনকার প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এসবের মূলে ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসকরা।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্তে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কমিশন গত ১২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি নির্বাচনের সব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করা হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। এ উদ্দেশ্যে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ একটি সেলও গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি পায়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ধীরে ধীরে প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এ সময় কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে যে নির্বাচন হয়, তা ছিল সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হিসেবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দল এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বিষয়টি অনুধাবন করতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। দলটিকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার হার ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়। সাবেক ডিসিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

বিগত তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আর ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়া বিতর্কিত ডিসিদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এর মধ্যে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৩ জন সাবেক ডিসিকে ওএসডি করা হয়। আর ২০ ফেব্রুয়ারি ২২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে ১২ জনকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এবার ‘সততা’র চ্যালেঞ্জ, সতর্ক ডিসিরা

আগের নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির সামনে থাকায় এবারের নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছেন বর্তমান ডিসিরা।

তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ এড়াতে সচেষ্ট রয়েছেন। দায়িত্ব পালনে সামান্য বিচ্যুতিও ভবিষ্যতে তাদের প্রশাসনিক জবাবদিহিতার মুখে ফেলতে পারে– এ বিষয় মাথায় রেখে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।

সারাদেশ-এর আরও খবর