মহাকাশে বিশাল আয়না বসিয়ে রাতের অন্ধকারে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো পৌঁছে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ স্টার্টআপ সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। এ প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য ভারতের মহাকাশ সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গেও চুক্তি করেছে তারা। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব এবং রাতের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা।
বিদ্যুতের মতো সূর্যের আলোও যদি প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাবেচা করা যেত, তাহলে কেমন হতো? শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো লাগলেও এমনই এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মহাকাশ স্টার্টআপ ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। মহাকাশে বিশাল আয়না পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৌঁছে দিতে চায় সংস্থাটি।
মূলত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সময় বাড়ানো, দুর্যোগকবলিত এলাকায় আলো পৌঁছে দেওয়া এবং রাতের উদ্ধারকাজে সহায়তার লক্ষ্যেই সূর্যালোককে চাহিদাভিত্তিক পরিষেবায় রূপ দিতে চায় তারা। এ প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য দুটি রকেট উৎক্ষেপণে ভারতীয় সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গে চুক্তিও করেছে রিফ্লেক্ট অরবিটাল। তবে রাতের আকাশ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কী এই পরিকল্পনা?
সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৪৫ কিলোমিটার ওপরে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১৮ বাই ১৮ মিটার আকারের বিশাল আয়না স্থাপন করা হবে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও মহাকাশে থাকা আয়নাগুলোর অবস্থান ও অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করা যাবে।
২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক উপগ্রহ ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব আয়না পৃথিবীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আলো ফেলতে পারবে। গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পছন্দের এলাকায় আলো সরবরাহের অনুরোধ জানাতে পারবেন। অর্থের বিনিময়ে এ পরিষেবা গ্রহণকারীদের নির্ধারিত এলাকায় আলো পৌঁছে দিতে মহাকাশে থাকা আয়নাগুলোর অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করবে সংস্থাটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে এ ধরনের ৫০ হাজার উপগ্রহ পাঠাতে চায় রিফ্লেক্ট অরবিটাল। সংস্থাটির দাবি, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিফলিত আলো পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতো হবে। তবে উপগ্রহের সংখ্যা বাড়লে আলোর তীব্রতা ও স্থায়িত্বও বাড়ানো সম্ভব হবে। কৃষিজমিতে আলো সরবরাহ, নষ্ট হয়ে যাওয়া সড়কবাতির বিকল্প ব্যবস্থা এবং সামরিক অভিযানে সহায়তার মতো কাজেও এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে তারা।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলে লোন পাইনের কাছে মাউন্ট হুইটনির অদূরে এ প্রযুক্তির একটি বাস্তব মহড়া চালিয়েছে সংস্থাটি। স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত ওই পরীক্ষায় মরুভূমির ওপর তীব্র আলো ফেলা হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্মিত হন। তাঁদের একজন ওই আলোকে ‘চোখধাঁধানো’ বলে বর্ণনা করেছেন। সংস্থাটির মুখপাত্রের দাবি, রাতের অন্ধকারে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলই তাদের প্রথম গ্রাহক হতে পারে। জীবন রক্ষার কাজে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা তুলে ধরতেই এ মহড়া চালানো হয়েছে।
বায়ুমণ্ডলের বাধা ও আলোকদূষণের আশঙ্কা
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ (এফসিসি) আগামী বছর পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের অনুমোদন দিয়েছে। তবে এ অনুমোদনের পরই প্রকল্পটির বিরোধিতায় সরব হয়েছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত সূর্যালোক পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসার সময় বায়ুমণ্ডলের অণু ও অ্যারোসলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর পর আলো আবার প্রতিফলিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে বিচ্ছুরিত হতে পারে। ফলে নির্ধারিত এলাকার বাইরেও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আলোর প্রভাব পড়বে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, মূল আলোকিত কেন্দ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরেও আলোর উজ্জ্বলতা পূর্ণিমার চাঁদের আলোর চেয়ে বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, যারা অর্থের বিনিময়ে এ পরিষেবা নেবেন না, তাঁরাও অনিচ্ছাকৃতভাবে এর প্রভাবের শিকার হতে পারেন।
বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের সমালোচনা
গত আগস্টে পরিবেশবিষয়ক আইনি সংস্থা ‘আর্থজাস্টিস’-এর মাধ্যমে চারটি সংগঠন এফসিসির কাছে প্রকল্পটির অনুমোদন পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে। আর্থজাস্টিসের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জ্যান হ্যাসেলম্যান প্রকল্পটিকে ‘নির্বোধ’ ও ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের বিবর্তন হয়েছে দিন ও রাতের ছন্দের ওপর ভিত্তি করে। এর সঙ্গে ছিনিমিনি খেলা মোটেই ভালো কাজ নয়। ৫০ হাজার আয়না-উপগ্রহ পাঠানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আমাদের চেনা রাতের আকাশ চিরতরে হারিয়ে যাবে।”
বিজ্ঞানীদের মতে, পাখি, পোকামাকড় ও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা খাদ্য সংগ্রহ, আশ্রয় এবং প্রজননের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য দিন-রাতের নিয়মিত পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। এ ছন্দ ব্যাহত হলে বহু প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদমেও বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
‘আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ও এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাদের আশঙ্কা, টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি প্রতিফলিত তীব্র আলোর দিকে তাকালে চোখের ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া মহাকাশে বিপুলসংখ্যক আয়না-উপগ্রহ যুক্ত হলে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইলন মাস্কের সংস্থা ‘স্পেসএক্স’-এর পৃথিবীর কক্ষপথে বিপুলসংখ্যক ডেটাসেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়েও বিতর্ক
রিফ্লেক্ট অরবিটালের যুক্তি, রাতে সৌর প্যানেলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে পরিবেশের উপকার হতে পারে বলেও দাবি করছে সংস্থাটি।
তবে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একাংশ পৃথিবীতে সূর্যের শক্তির স্বাভাবিক ভারসাম্যে এ ধরনের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছেন। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড হো বলেন, বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। উষ্ণায়ন কমাতে কেউ কেউ মহাকাশে পৃথিবীর বিপরীত দিকে মুখ করে আয়না স্থাপন করে সূর্যের আলো মহাকাশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করছেন। অথচ রিফ্লেক্ট অরবিটাল সেই আয়নাই পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে আরও আলো ও শক্তি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
সমালোচনার মুখে রিফ্লেক্ট অরবিটাল জানিয়েছে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ এলাকাগুলোকে আলোর আওতার বাইরে রাখার বিষয়ে বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র বলেন, “আমরা নজরদারিকে স্বাগত জানাই। সরকার, বিজ্ঞানী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করাই আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করি।”
মহাকাশে আয়না বসিয়ে রাতে সূর্যের আলো বিক্রি করতে চায় মার্কিন স্টার্টআপ সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’: পরিবেশবিদেরা উদ্বেগ-চলছে বিতর্ক
মহাকাশে বিশাল আয়না বসিয়ে রাতের অন্ধকারে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো পৌঁছে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ স্টার্টআপ সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। এ প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য ভারতের মহাকাশ সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গেও চুক্তি করেছে তারা। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব এবং রাতের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা।
বিদ্যুতের মতো সূর্যের আলোও যদি প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাবেচা করা যেত, তাহলে কেমন হতো? শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো লাগলেও এমনই এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মহাকাশ স্টার্টআপ ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। মহাকাশে বিশাল আয়না পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৌঁছে দিতে চায় সংস্থাটি।
মূলত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সময় বাড়ানো, দুর্যোগকবলিত এলাকায় আলো পৌঁছে দেওয়া এবং রাতের উদ্ধারকাজে সহায়তার লক্ষ্যেই সূর্যালোককে চাহিদাভিত্তিক পরিষেবায় রূপ দিতে চায় তারা। এ প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য দুটি রকেট উৎক্ষেপণে ভারতীয় সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর সঙ্গে চুক্তিও করেছে রিফ্লেক্ট অরবিটাল। তবে রাতের আকাশ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কী এই পরিকল্পনা?
সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৪৫ কিলোমিটার ওপরে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ১৮ বাই ১৮ মিটার আকারের বিশাল আয়না স্থাপন করা হবে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও মহাকাশে থাকা আয়নাগুলোর অবস্থান ও অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করা যাবে।
২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক উপগ্রহ ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব আয়না পৃথিবীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আলো ফেলতে পারবে। গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পছন্দের এলাকায় আলো সরবরাহের অনুরোধ জানাতে পারবেন। অর্থের বিনিময়ে এ পরিষেবা গ্রহণকারীদের নির্ধারিত এলাকায় আলো পৌঁছে দিতে মহাকাশে থাকা আয়নাগুলোর অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করবে সংস্থাটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে এ ধরনের ৫০ হাজার উপগ্রহ পাঠাতে চায় রিফ্লেক্ট অরবিটাল। সংস্থাটির দাবি, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিফলিত আলো পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতো হবে। তবে উপগ্রহের সংখ্যা বাড়লে আলোর তীব্রতা ও স্থায়িত্বও বাড়ানো সম্ভব হবে। কৃষিজমিতে আলো সরবরাহ, নষ্ট হয়ে যাওয়া সড়কবাতির বিকল্প ব্যবস্থা এবং সামরিক অভিযানে সহায়তার মতো কাজেও এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে তারা।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলে লোন পাইনের কাছে মাউন্ট হুইটনির অদূরে এ প্রযুক্তির একটি বাস্তব মহড়া চালিয়েছে সংস্থাটি। স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত ওই পরীক্ষায় মরুভূমির ওপর তীব্র আলো ফেলা হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্মিত হন। তাঁদের একজন ওই আলোকে ‘চোখধাঁধানো’ বলে বর্ণনা করেছেন। সংস্থাটির মুখপাত্রের দাবি, রাতের অন্ধকারে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলই তাদের প্রথম গ্রাহক হতে পারে। জীবন রক্ষার কাজে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা তুলে ধরতেই এ মহড়া চালানো হয়েছে।
বায়ুমণ্ডলের বাধা ও আলোকদূষণের আশঙ্কা
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ (এফসিসি) আগামী বছর পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের অনুমোদন দিয়েছে। তবে এ অনুমোদনের পরই প্রকল্পটির বিরোধিতায় সরব হয়েছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত সূর্যালোক পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসার সময় বায়ুমণ্ডলের অণু ও অ্যারোসলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর পর আলো আবার প্রতিফলিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে বিচ্ছুরিত হতে পারে। ফলে নির্ধারিত এলাকার বাইরেও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আলোর প্রভাব পড়বে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, মূল আলোকিত কেন্দ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরেও আলোর উজ্জ্বলতা পূর্ণিমার চাঁদের আলোর চেয়ে বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, যারা অর্থের বিনিময়ে এ পরিষেবা নেবেন না, তাঁরাও অনিচ্ছাকৃতভাবে এর প্রভাবের শিকার হতে পারেন।
বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের সমালোচনা
গত আগস্টে পরিবেশবিষয়ক আইনি সংস্থা ‘আর্থজাস্টিস’-এর মাধ্যমে চারটি সংগঠন এফসিসির কাছে প্রকল্পটির অনুমোদন পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে। আর্থজাস্টিসের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জ্যান হ্যাসেলম্যান প্রকল্পটিকে ‘নির্বোধ’ ও ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের বিবর্তন হয়েছে দিন ও রাতের ছন্দের ওপর ভিত্তি করে। এর সঙ্গে ছিনিমিনি খেলা মোটেই ভালো কাজ নয়। ৫০ হাজার আয়না-উপগ্রহ পাঠানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আমাদের চেনা রাতের আকাশ চিরতরে হারিয়ে যাবে।”
বিজ্ঞানীদের মতে, পাখি, পোকামাকড় ও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা খাদ্য সংগ্রহ, আশ্রয় এবং প্রজননের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য দিন-রাতের নিয়মিত পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। এ ছন্দ ব্যাহত হলে বহু প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদমেও বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
‘আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ও এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাদের আশঙ্কা, টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি প্রতিফলিত তীব্র আলোর দিকে তাকালে চোখের ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া মহাকাশে বিপুলসংখ্যক আয়না-উপগ্রহ যুক্ত হলে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইলন মাস্কের সংস্থা ‘স্পেসএক্স’-এর পৃথিবীর কক্ষপথে বিপুলসংখ্যক ডেটাসেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়েও বিতর্ক
রিফ্লেক্ট অরবিটালের যুক্তি, রাতে সৌর প্যানেলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে পরিবেশের উপকার হতে পারে বলেও দাবি করছে সংস্থাটি।
তবে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একাংশ পৃথিবীতে সূর্যের শক্তির স্বাভাবিক ভারসাম্যে এ ধরনের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছেন। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড হো বলেন, বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। উষ্ণায়ন কমাতে কেউ কেউ মহাকাশে পৃথিবীর বিপরীত দিকে মুখ করে আয়না স্থাপন করে সূর্যের আলো মহাকাশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করছেন। অথচ রিফ্লেক্ট অরবিটাল সেই আয়নাই পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে আরও আলো ও শক্তি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
সমালোচনার মুখে রিফ্লেক্ট অরবিটাল জানিয়েছে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ এলাকাগুলোকে আলোর আওতার বাইরে রাখার বিষয়ে বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র বলেন, “আমরা নজরদারিকে স্বাগত জানাই। সরকার, বিজ্ঞানী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করাই আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করি।”
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ জাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
আলহাজ্ব শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক
তাকছিমুন নাহার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
ইঞ্জিনিয়ার কে এম মেহেদী হাসান
|
মোবাইল: ০১৭১১২৪৯৭৭০
হোয়াটস্অ্যাপ: ০১৭১১২৪৯৭৭০
প্রধান কার্যালয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
Email: deshpatrika24@gmail.com |
প্রিন্টের তারিখ ও সময়: November 4, 2026, 2:36 pm