ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন চলাচলকারী লাখো নারীর জন্য যাতায়াত কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বিষয় নয়; অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে ঝুঁকি সামলানোর এক দৈনন্দিন অনুশীলন। কোন বাসে উঠবেন, কোথায় দাঁড়াবেন, কখন বের হবেন কিংবা ভিড়ের মধ্যে কতটা ব্যক্তিগত পরিসর ধরে রাখতে পারবেন-এসব বিষয়ও তাদের হিসাব করে চলতে হয়। এমন বাস্তবতায় নারীদের জন্য চালু হওয়া পৃথক ‘গোলাপি বাস’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে-নিরাপদে চলাচলের সুযোগ।
নারী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও পেশাজীবীদের জন্য এসব বাস হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ কিংবা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে সারাক্ষণ অস্বস্তি ও উদ্বেগ ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের পথও আরও সহজ করতে পারে।
তবে এর মধ্যেই শহরকে ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-আমরা কি নারীদের জন্য গণপরিবহনকে নিরাপদ করে তুলছি, নাকি একটি অনিরাপদ গণপরিসর থেকে নারীদের নিরাপদ কিছু আলাদা জায়গায় সরে যেতে বলছি?
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ:
এক শতাব্দীরও বেশি আগে বেগম রোকেয়া তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (১৯০৫)-এ ঠিক এমনই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন। তাঁর কল্পিত ‘লেডিল্যান্ড’ শুধু এমন একটি জায়গা ছিল না, যেখানে নারীরা বিপদ থেকে সুরক্ষিত; বরং এটি ছিল এমন এক সমাজের কল্পনা, যেখানে জনপরিসরে কার চলাচলের অধিকার থাকবে-সেই প্রচলিত ধারণাটিকেই নতুনভাবে ভাবা হয়েছিল। সেখানে নারীরা পরিচ্ছন্ন, প্রযুক্তিনির্ভর ও উন্নত পরিবেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতেন, আর পুরুষদের রাখা হয়েছিল গৃহের অন্দরমহলে।
রোকেয়া মূলত পর্দাপ্রথার প্রচলিত যুক্তিটিকেই উল্টে দিয়েছিলেন। নারীদের নিরাপত্তার জন্য তাদের চলাচল সীমাবদ্ধ না করে তিনি পুরুষদেরই জনপরিসর থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে নারীরা বাধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন।
তাই ‘লেডিল্যান্ড’-এর গুরুত্ব কেবল তার কল্পিত উড়ন্ত গাড়িতে নয়; বরং এর গভীর তাৎপর্য হলো-নিরাপত্তার দায় চিরকাল যারা ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
শার্লট পারকিন্স গিলম্যানের ‘হারল্যান্ড’ (১৯১৫)-এও আমরা এমন একটি কল্পিত সমাজের দেখা পাই। সেখানে নারীদের আত্মরক্ষার জন্য আলাদা কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আড়ালে থাকতে হয় না। কারণ, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য তৈরি করে এমন সামাজিক কাঠামোই সেখানে বদলে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা আলাদা কোনো ব্যবস্থার বিষয় নয়; বরং পুরো সমাজব্যবস্থার মধ্যেই তা অন্তর্ভুক্ত।
এর কয়েক দশক পর জোয়ানা রাসের ‘দ্য ফিমেল ম্যান’ (১৯৭৫) নারী, চলাচল ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আরও বিস্তৃতভাবে সামনে আনে। উপন্যাসে কল্পিত ‘হোয়াইলঅ্যাওয়ে’ এমন একটি সমাজের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে পুরুষের সহিংসতার আশঙ্কায় নারীর চলাচল সীমাবদ্ধ নয়। বইটির অন্যান্য কল্পিত সমাজের সঙ্গে এর তুলনা একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনে—কোন নারী কোথায়, কখন এবং কীভাবে চলাচল করবেন, সেটিকে আমরা যতই ব্যক্তিগত ‘পছন্দ’ হিসেবে দেখি না কেন, বাস্তবে তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তার চারপাশের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার মাধ্যমে।
মার্জ পিয়ার্সির ‘উইম্যান অন দ্য এজ অব টাইম’ (১৯৭৬)-এও এমন এক ভবিষ্যৎ সমাজের কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে পরিবহন ও জনপরিকাঠামো সবার জন্য উন্মুক্ত, সহজলভ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত।
এই চারটি সাহিত্যকর্মের সময়, প্রেক্ষাপট, রাজনীতি ও কল্পনার ধরন একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে—নারীর মুক্তি কেবল একটি অপরিবর্তিত অনিরাপদ জনপরিসরের ভেতরে ছোট ছোট নিরাপদ জায়গা তৈরি করে অর্জিত হয় না। বরং যে জনপরিসর নারীদের জন্য অনিরাপদ, সেই পরিবেশকেই বদলে দিতে হয়।
এখানেই ঢাকার ‘গোলাপি বাস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য সামনে আনে:
একদিকে, অনিরাপদ বাস্তবতায় নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন একটি প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। কোনো নারী যদি গণপরিবহন পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরিবর্তে একটি গোলাপি বাসে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে এর বাস্তব মূল্য অবশ্যই আছে। অন্যদিকে, এই পৃথকীকরণ অনিচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তার দায় আবারও নারীর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। সাধারণ বাসে হয়রানি কেন হচ্ছে—সে প্রশ্ন না তুলে নারীকেই বলা হয় অন্য বাসে উঠতে। সবার জন্য জনপরিসর নিরাপদ করার পরিবর্তে তৈরি হয় নির্দিষ্ট কিছু ‘নিরাপদ জায়গা’।
এটাই হতে পারে ‘গোলাপি বাসের বৈপরীত্য’-স্বল্পমেয়াদে এমন একটি ব্যবস্থা নারীর চলাচলের স্বাধীনতা বাড়াতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বৃহত্তর পরিবহনব্যবস্থায় সমতার সীমাবদ্ধতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
তাই প্রশ্নটি ‘গোলাপি বাস ভালো না খারাপ’-এভাবে দেখার নয়। বরং প্রশ্ন হলো, নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক একটি শহর গড়ে তোলার দীর্ঘ যাত্রায় এই বাসগুলোর ভূমিকা কী হবে?
নারীদের জন্য পৃথক বাসকেই যদি চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে শহর এমন একটি ধারণাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে যে নারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য আলাদা জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু যদি বৃহত্তর জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর তাৎপর্য অনেক বেশি। আজ নারীদের নিরাপদে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে এমন একটি শহর গড়ে তোলা, যেখানে আগামী দিনে পৃথকীকরণের প্রয়োজন ক্রমেই কমে আসবে-এই দুই কাজ পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে সঠিক পথ।
কারণ, চলাচল শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার বিষয় নয়। চলাচলের স্বাধীনতা মানেই সুযোগের স্বাধীনতা।
যে নারী নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন না, তিনি হয়তো একটি চাকরি নিতে পারবেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবেন না, স্বাস্থ্যসেবা নিতে বাধার মুখে পড়বেন, ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন না কিংবা সমাজ ও জনজীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিতে পারবেন না। অনিরাপদ গণপরিবহনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তাই কম নয়। এর বোঝা গিয়ে পড়ে নারীর ওপর-তাঁকে নির্দিষ্ট কিছু পথ, সময় কিংবা পরিবহনব্যবস্থা এড়িয়ে চলতে হয়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই সমীকরণটিই বদলে দেওয়া:
নারীদের যেন প্রতিদিন কোথায় কতটা ঝুঁকি রয়েছে, তা হিসাব করে চলতে না হয়; বরং নগরব্যবস্থাই যেন সেই ঝুঁকি কমিয়ে আনে। এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্টপ, পর্যাপ্ত ও কার্যকর সড়কবাতি, নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, প্রশিক্ষিত চালক ও কর্মী, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ, সহজলভ্য শেষ-মাইল সংযোগ এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল নগর পরিকল্পনা।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, ‘নারী’ কোনো একক শ্রেণি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী, ভোরে কর্মস্থলে যাওয়া একজন পোশাকশ্রমিক, প্রতিবন্ধী একজন নারী, একজন বয়স্ক নারী কিংবা সন্তান নিয়ে চলাচলকারী একজন মায়ের প্রয়োজন এক নয়। তাই একটি নির্দিষ্ট ধরনের বাস চালু করলেই সবার চলাচলের সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহনব্যবস্থাকে নারীদের এই ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানেই হয়তো বেগম রোকেয়ার চিন্তা আজও সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক:
রোকেয়া উড়ন্ত গাড়ির কল্পনা করেছিলেন নারীদের পৃথিবী থেকে আড়াল করার জন্য নয়; বরং নারীরও যে অবাধে পৃথিবীর পথে চলার অধিকার রয়েছে, সেটি দেখানোর জন্য। ‘লেডিল্যান্ড’ নারীদের জন্য আরও একটি নিরাপদ ঘেরাটোপ তৈরির স্বপ্ন ছিল না; বরং এমন একটি সমাজের স্বপ্ন ছিল, যেখানে নারীদের নিরাপদ রাখতে আলাদা কোনো ঘেরাটোপেরই প্রয়োজন হবে না।
তাই ঢাকার ‘গোলাপি বাস’কে নারীমুক্তির ব্যর্থতা কিংবা চূড়ান্ত সাফল্য-কোনোটিই বলা যায় না। এটি একটি বাস্তব ও জরুরি সমস্যার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া; একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের আরও অনেক কাজ এখনো বাকি।
অগ্রগতির মাপকাঠি হওয়া উচিত-নারীদের জন্য আমরা কতগুলো আলাদা নিরাপদ জায়গা তৈরি করেছি, তা নয়; বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে না হয়েও একজন নারী কতটা স্বাধীনভাবে শহরের পথে চলতে পারেন, সেটি।
হয়তো আমাদের প্রকৃত গন্তব্য ঢাকার গোলাপি বাস আর রোকেয়ার লেডিল্যান্ডের মাঝামাঝি কোথাও-এমন একটি শহর, যেখানে একজন নারী যেকোনো বাসে, যেকোনো সময়ে, যেকোনো পথে নিশ্চিন্তে উঠতে পারবেন। কারণ তিনি কোনো বিশেষ নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেয়েছেন বলে নয়; বরং পুরো শহরটাই তাঁর স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারের প্রতি যথেষ্ট নিরাপদ, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে।
লেখক: কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও উন্নয়ন কর্মী
লেডিল্যান্ড থেকে ঢাকার ‘গোলাপি বাস’
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন চলাচলকারী লাখো নারীর জন্য যাতায়াত কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বিষয় নয়; অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে ঝুঁকি সামলানোর এক দৈনন্দিন অনুশীলন। কোন বাসে উঠবেন, কোথায় দাঁড়াবেন, কখন বের হবেন কিংবা ভিড়ের মধ্যে কতটা ব্যক্তিগত পরিসর ধরে রাখতে পারবেন-এসব বিষয়ও তাদের হিসাব করে চলতে হয়। এমন বাস্তবতায় নারীদের জন্য চালু হওয়া পৃথক ‘গোলাপি বাস’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে-নিরাপদে চলাচলের সুযোগ।
নারী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও পেশাজীবীদের জন্য এসব বাস হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ কিংবা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে সারাক্ষণ অস্বস্তি ও উদ্বেগ ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের পথও আরও সহজ করতে পারে।
তবে এর মধ্যেই শহরকে ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-আমরা কি নারীদের জন্য গণপরিবহনকে নিরাপদ করে তুলছি, নাকি একটি অনিরাপদ গণপরিসর থেকে নারীদের নিরাপদ কিছু আলাদা জায়গায় সরে যেতে বলছি?
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ:
এক শতাব্দীরও বেশি আগে বেগম রোকেয়া তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (১৯০৫)-এ ঠিক এমনই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন। তাঁর কল্পিত ‘লেডিল্যান্ড’ শুধু এমন একটি জায়গা ছিল না, যেখানে নারীরা বিপদ থেকে সুরক্ষিত; বরং এটি ছিল এমন এক সমাজের কল্পনা, যেখানে জনপরিসরে কার চলাচলের অধিকার থাকবে-সেই প্রচলিত ধারণাটিকেই নতুনভাবে ভাবা হয়েছিল। সেখানে নারীরা পরিচ্ছন্ন, প্রযুক্তিনির্ভর ও উন্নত পরিবেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতেন, আর পুরুষদের রাখা হয়েছিল গৃহের অন্দরমহলে।
রোকেয়া মূলত পর্দাপ্রথার প্রচলিত যুক্তিটিকেই উল্টে দিয়েছিলেন। নারীদের নিরাপত্তার জন্য তাদের চলাচল সীমাবদ্ধ না করে তিনি পুরুষদেরই জনপরিসর থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে নারীরা বাধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন।
তাই ‘লেডিল্যান্ড’-এর গুরুত্ব কেবল তার কল্পিত উড়ন্ত গাড়িতে নয়; বরং এর গভীর তাৎপর্য হলো-নিরাপত্তার দায় চিরকাল যারা ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
শার্লট পারকিন্স গিলম্যানের ‘হারল্যান্ড’ (১৯১৫)-এও আমরা এমন একটি কল্পিত সমাজের দেখা পাই। সেখানে নারীদের আত্মরক্ষার জন্য আলাদা কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আড়ালে থাকতে হয় না। কারণ, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য তৈরি করে এমন সামাজিক কাঠামোই সেখানে বদলে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা আলাদা কোনো ব্যবস্থার বিষয় নয়; বরং পুরো সমাজব্যবস্থার মধ্যেই তা অন্তর্ভুক্ত।
এর কয়েক দশক পর জোয়ানা রাসের ‘দ্য ফিমেল ম্যান’ (১৯৭৫) নারী, চলাচল ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আরও বিস্তৃতভাবে সামনে আনে। উপন্যাসে কল্পিত ‘হোয়াইলঅ্যাওয়ে’ এমন একটি সমাজের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে পুরুষের সহিংসতার আশঙ্কায় নারীর চলাচল সীমাবদ্ধ নয়। বইটির অন্যান্য কল্পিত সমাজের সঙ্গে এর তুলনা একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনে—কোন নারী কোথায়, কখন এবং কীভাবে চলাচল করবেন, সেটিকে আমরা যতই ব্যক্তিগত ‘পছন্দ’ হিসেবে দেখি না কেন, বাস্তবে তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তার চারপাশের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার মাধ্যমে।
মার্জ পিয়ার্সির ‘উইম্যান অন দ্য এজ অব টাইম’ (১৯৭৬)-এও এমন এক ভবিষ্যৎ সমাজের কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে পরিবহন ও জনপরিকাঠামো সবার জন্য উন্মুক্ত, সহজলভ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত।
এই চারটি সাহিত্যকর্মের সময়, প্রেক্ষাপট, রাজনীতি ও কল্পনার ধরন একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে—নারীর মুক্তি কেবল একটি অপরিবর্তিত অনিরাপদ জনপরিসরের ভেতরে ছোট ছোট নিরাপদ জায়গা তৈরি করে অর্জিত হয় না। বরং যে জনপরিসর নারীদের জন্য অনিরাপদ, সেই পরিবেশকেই বদলে দিতে হয়।
এখানেই ঢাকার ‘গোলাপি বাস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য সামনে আনে:
একদিকে, অনিরাপদ বাস্তবতায় নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন একটি প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। কোনো নারী যদি গণপরিবহন পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরিবর্তে একটি গোলাপি বাসে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে এর বাস্তব মূল্য অবশ্যই আছে। অন্যদিকে, এই পৃথকীকরণ অনিচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তার দায় আবারও নারীর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। সাধারণ বাসে হয়রানি কেন হচ্ছে—সে প্রশ্ন না তুলে নারীকেই বলা হয় অন্য বাসে উঠতে। সবার জন্য জনপরিসর নিরাপদ করার পরিবর্তে তৈরি হয় নির্দিষ্ট কিছু ‘নিরাপদ জায়গা’।
এটাই হতে পারে ‘গোলাপি বাসের বৈপরীত্য’-স্বল্পমেয়াদে এমন একটি ব্যবস্থা নারীর চলাচলের স্বাধীনতা বাড়াতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বৃহত্তর পরিবহনব্যবস্থায় সমতার সীমাবদ্ধতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
তাই প্রশ্নটি ‘গোলাপি বাস ভালো না খারাপ’-এভাবে দেখার নয়। বরং প্রশ্ন হলো, নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক একটি শহর গড়ে তোলার দীর্ঘ যাত্রায় এই বাসগুলোর ভূমিকা কী হবে?
নারীদের জন্য পৃথক বাসকেই যদি চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে শহর এমন একটি ধারণাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে যে নারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য আলাদা জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু যদি বৃহত্তর জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর তাৎপর্য অনেক বেশি। আজ নারীদের নিরাপদে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে এমন একটি শহর গড়ে তোলা, যেখানে আগামী দিনে পৃথকীকরণের প্রয়োজন ক্রমেই কমে আসবে-এই দুই কাজ পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে সঠিক পথ।
কারণ, চলাচল শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার বিষয় নয়। চলাচলের স্বাধীনতা মানেই সুযোগের স্বাধীনতা।
যে নারী নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন না, তিনি হয়তো একটি চাকরি নিতে পারবেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবেন না, স্বাস্থ্যসেবা নিতে বাধার মুখে পড়বেন, ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন না কিংবা সমাজ ও জনজীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিতে পারবেন না। অনিরাপদ গণপরিবহনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তাই কম নয়। এর বোঝা গিয়ে পড়ে নারীর ওপর-তাঁকে নির্দিষ্ট কিছু পথ, সময় কিংবা পরিবহনব্যবস্থা এড়িয়ে চলতে হয়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই সমীকরণটিই বদলে দেওয়া:
নারীদের যেন প্রতিদিন কোথায় কতটা ঝুঁকি রয়েছে, তা হিসাব করে চলতে না হয়; বরং নগরব্যবস্থাই যেন সেই ঝুঁকি কমিয়ে আনে। এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্টপ, পর্যাপ্ত ও কার্যকর সড়কবাতি, নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, প্রশিক্ষিত চালক ও কর্মী, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ, সহজলভ্য শেষ-মাইল সংযোগ এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল নগর পরিকল্পনা।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, ‘নারী’ কোনো একক শ্রেণি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী, ভোরে কর্মস্থলে যাওয়া একজন পোশাকশ্রমিক, প্রতিবন্ধী একজন নারী, একজন বয়স্ক নারী কিংবা সন্তান নিয়ে চলাচলকারী একজন মায়ের প্রয়োজন এক নয়। তাই একটি নির্দিষ্ট ধরনের বাস চালু করলেই সবার চলাচলের সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহনব্যবস্থাকে নারীদের এই ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানেই হয়তো বেগম রোকেয়ার চিন্তা আজও সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক:
রোকেয়া উড়ন্ত গাড়ির কল্পনা করেছিলেন নারীদের পৃথিবী থেকে আড়াল করার জন্য নয়; বরং নারীরও যে অবাধে পৃথিবীর পথে চলার অধিকার রয়েছে, সেটি দেখানোর জন্য। ‘লেডিল্যান্ড’ নারীদের জন্য আরও একটি নিরাপদ ঘেরাটোপ তৈরির স্বপ্ন ছিল না; বরং এমন একটি সমাজের স্বপ্ন ছিল, যেখানে নারীদের নিরাপদ রাখতে আলাদা কোনো ঘেরাটোপেরই প্রয়োজন হবে না।
তাই ঢাকার ‘গোলাপি বাস’কে নারীমুক্তির ব্যর্থতা কিংবা চূড়ান্ত সাফল্য-কোনোটিই বলা যায় না। এটি একটি বাস্তব ও জরুরি সমস্যার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া; একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের আরও অনেক কাজ এখনো বাকি।
অগ্রগতির মাপকাঠি হওয়া উচিত-নারীদের জন্য আমরা কতগুলো আলাদা নিরাপদ জায়গা তৈরি করেছি, তা নয়; বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে না হয়েও একজন নারী কতটা স্বাধীনভাবে শহরের পথে চলতে পারেন, সেটি।
হয়তো আমাদের প্রকৃত গন্তব্য ঢাকার গোলাপি বাস আর রোকেয়ার লেডিল্যান্ডের মাঝামাঝি কোথাও-এমন একটি শহর, যেখানে একজন নারী যেকোনো বাসে, যেকোনো সময়ে, যেকোনো পথে নিশ্চিন্তে উঠতে পারবেন। কারণ তিনি কোনো বিশেষ নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেয়েছেন বলে নয়; বরং পুরো শহরটাই তাঁর স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারের প্রতি যথেষ্ট নিরাপদ, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে।
লেখক: কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও উন্নয়ন কর্মী
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ জাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
আলহাজ্ব শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক
তাকছিমুন নাহার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
ইঞ্জিনিয়ার কে এম মেহেদী হাসান
|
মোবাইল: ০১৭১১২৪৯৭৭০
হোয়াটস্অ্যাপ: ০১৭১১২৪৯৭৭০
প্রধান কার্যালয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
Email: deshpatrika24@gmail.com |
প্রিন্টের তারিখ ও সময়: August 25, 2026, 4:28 am