নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই, চাপে সাধারণ মানুষ

সবজি, ডিম, মাছ, মুরগি, আটা-ময়দা ও ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী; আয় না বাড়লেও বাড়ছে সংসার খরচ

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     16-10-2026    27
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই, চাপে সাধারণ মানুষ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন রাজধানীর সাধারণ ক্রেতারা। গত সপ্তাহের তুলনায় বেশ কিছু সবজির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিম, মাছ, মুরগি, আটা, ময়দা ও ভোজ্যতেলের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের দৈনন্দিন বাজার খরচ বেড়েই চলেছে। গরু ও খাসির মাংসের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে স্বস্তি নেই।

শুক্রবার রাজধানীর নয়াবাজার, কারওয়ান বাজার ও কেরানীগঞ্জের বউবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় একই টাকায় আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য কেনা যাচ্ছে।

আটা-ময়দার দাম বাড়ায় চাপে বেকারিপণ্য নয়াবাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা ৫০ টাকা এবং ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে খোলা আটার কেজি ছিল ৪৫ টাকা এবং ময়দা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। দুই কেজির প্যাকেট ময়দা বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। ব্যবসায়ীদের দাবি, ৫০ কেজির ময়দার বস্তার দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে।

ময়দার দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে বনরুটি ও অন্যান্য বেকারিপণ্যে। গত শনিবার থেকে রুটি, কেক ও বিস্কুটের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তা আপাতত স্থগিত রাখতে সম্মত হন ব্যবসায়ীরা। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, আগের দামে সব বেকারিপণ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

বাড়ছে সবজির দাম, সরবরাহে ঘাটতির দাবি বিক্রেতাদের রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পটোল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ৯০ টাকা, গোল বেগুন ১১০ থেকে ১৪০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং শিম ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁপের কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

বিক্রেতাদের ভাষ্য, বর্ষা ও অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহ এবং পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। এতে সরবরাহ কমে পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছেন তাঁরা।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা শাহানাজ বেগম বলেন, বৃষ্টির কারণে বর্তমানে সবজি সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ কারণে দাম বেড়েছে। তবে নতুন সবজি বাজারে এলে কয়েক দিনের মধ্যে দাম কমতে পারে।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের বাসিন্দা ক্রেতা সুমি আক্তার বলেন, ‘সব জিনিসপত্রের দামই তো বাড়তির দিকে। এতে আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে। আগে ২০০ টাকার সবজি কিনলে তিন-চার দিন চলে যেত, এখন ৫০০ টাকার সবজি কিনেও কুলাচ্ছে না।’

ডজনপ্রতি ডিম ১৫০–১৬০ টাকা ডিমের বাজারেও উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। বর্তমানে প্রতি ডজন ডিম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাস আগে ডজনপ্রতি দাম ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা।

বিক্রেতাদের মতে, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও গরমের কারণে অনেক খামারে ডিম উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে মুরগির সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারদরে।

এদিকে, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং হাইব্রিড মুরগি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, দেড় মাস আগে ব্রয়লার মুরগির দাম বর্তমানের তুলনায় কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কম ছিল। তবে গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকায় মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

মাছের বাজারেও চড়া দাম, কিছুটা কমেছে ইলিশ মাছের বাজারেও ক্রেতাদের স্বস্তি নেই। বর্তমানে প্রতি কেজি রুই মাছ ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা, কাতলা ৪২০ থেকে ৪৪০ টাকা, পাঙাশ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, টেংরা প্রায় ৭০০ টাকা এবং ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি কই মাছের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কিছু দেশি মাছের দাম কেজিতে ১ হাজার টাকারও বেশি।

তবে ইলিশের দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। আকারভেদে প্রতি কেজি ইলিশ ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছ বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় দামে প্রভাব পড়েছে।

করছাড়ের সুফল নিয়ে প্রশ্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার মধ্যে কর-শুল্ক কমানোর সুফল খুচরা বাজারে পুরোপুরি না পৌঁছানোর অভিযোগও রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে চাল, আটা, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ ৬৩টি নিত্যপণ্যে কর কমানো হয়। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, এতে বাজারে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি; বরং কিছু পণ্যের দাম আরও বেড়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি এস এম নাজের হোসাইন ‘আমার দেশ’কে বলেন, কর কমানোর পরও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমেনি। বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৬ থেকে ৯ শতাংশ এবং বিভিন্ন মসলার দাম ১০ থেকে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

আয় না বাড়লেও বাড়ছে সংসার খরচ ক্রেতাদের অভিযোগ, চাল, ডাল, মাছ, ডিম, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই টাকায় আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে হচ্ছে তাঁদের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে স্বস্তি ফেরাতে পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, সরবরাহশৃঙ্খলে অযৌক্তিক ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং করছাড়ের সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো জরুরি। পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করা গেলে নিত্যপণ্যের দামের চাপ কমাতে সহায়তা হতে পারে।

জাতীয়-এর আরও খবর