নাটকের চরিত্রে :
আবুল মিয়া (বাবা) ::: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী
শাহনাজ (মা):::গৃহিণী, শান্ত ও ধৈর্যশীল
সজল (ছেলে) ::: চাকুরীর খোঁজে
মিম (মেয়ে):::ভার্সিটিতে পড়ে পরিবারের প্রতি বিরক্ত
দৃশ্য ১: পুরনো বসার ঘর, সন্ধ্যা নামে আস্তে আস্তে
বর্ণনা:
ঘরটা একটু অগোছালো। একটা সাদামাটা টেবিল, ছড়ানো বই, পুরনো সোফা—সব কিছুতেই ক্লান্তির ছাপ। জানালার বাইরে একটা ভাঙা হ্যাঙ্গারে ঝুলছে ধুতি। পেছনের দিকে একটা ঘোলাটে আয়না। সাইডে একটা ছোট ট্রাঙ্ক, পাশে একটা খালি চায়ের কাপ। ঘরের কোণে আবুল মিয়া বসে আছে, চোখে দৃষ্টি নেই, চা খাচ্ছে। আলোর ফোকাস ধীরে ধীরে তার মুখে পড়ে।
আবুল মিয়া :
(চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে বলে)
আমি একদিন ভাবতাম... আমার ছেলে বড় চাকরি করবে, মেয়েটা ডাক্তার হবে।
ভাবতাম, আমি আর শাহানাজ বারান্দায় বসে বিকেলে চা খাব... সন্তানরা ঘিরে থাকবে হাসিমুখে।
কিন্তু এখন!
(এক ঢোঁক চা খায়ে)
এই চায়েও যেন বিষ মেশানো... মিষ্টি নেই, স্বাদ নেই... যেমন জীবনেও নেই।
(পেছন থেকে শাহানাজ এসে কাপটা নিয়ে, চুপচাপ গুছাতে থাকে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু শান্ত স্বভাবের।)
আবুল মিয়া:
শাহানাজ..., সজল আজও বের হয়নি?
শাহানাজ:
না।
আবুল মিয়া:
তুমি কিছু বলো নাই?
শাহানাজ:
বলেছি... কিন্তু ও শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
বলে, মা, এই শহরে আমার কোনো দরকার নাই...
আবুল মিয়া :
এই ছেলেটার হাল দেখেছো!
আমি পেনশন থেকে ওর জন্য কোচিং ফি দিচ্ছি, আর সে আজও একটা ইন্টারভিউ দিতে গেল না?
(এই সময় মীম ঘরে ঢোকে, ভার্সিটির ব্যাগ ছুড়ে দেয় টেবিলে। কপালে বিরক্তি, কণ্ঠে জ্বালা)
মীম:
ঘরে ঢুকলেই শুনি অভিযোগ, হতাশা, বোঝা!
এই সংসারটাই বিষ হয়ে গেছে আমার জন্য!
সারাদিন ভার্সিটি, তারপর বাসায় ফিরে এই নাটক! আর ভাল লাগেনা।
আবুল মিয়া:
নাটক? মানে?
এই নাটকই তো তোদের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়ে বানালাম...
তুই বলিস, সংসার বিষ?
মীম:
আমি এই আটপৌরে জীবনে বাঁচতে চাই না বাবা...
আমি মুক্তি চাই।
আবুল মিয়া:
মুক্তি চাই? তাহলে যা... দরজা খোলা।
এই ঘরের তালা ভেঙেই তো তোদের স্বপ্ন গড়েছি।
আজ সেই চাবিটাও ভেঙে গেছে। চলে যা।
(মুহূর্তেই নীরবতা। শাহানাজ দাঁড়িয়ে থাকে মাঝখানে, যেন দুই দিকে ছিঁড়ে যাচ্ছে সে। ফ্লোরে পড়ে যায় চায়ের কাপ। ঘরে একধরনের ভারি নিঃশব্দ নেমে আসে।)
আবুল মিয়া:
একদিন এই ঘরে গান বাজতো... এখন কেবল নীরবতা।
নামে তো সংসার... আসলে কেবল ভাঙা চাবির ঘর।
(আলো ধীরে ধীরে নিভে আসে। আবুল মিয়ার চোখে জল ঝিকমিক করে। পেছনে বাজে এক হাল্কা হারমোনিয়ামের দুঃখী সুর....)
---------
নাট্যকার: মোহাম্মদ রাফি ইসলাম, সাথীবাড়ি, মিঠাপুকুর, রংপুর।