কিশোর গ্যাং আর সোশ্যাল মিডিয়া অপরাধের নতুন দুনিয়া

  অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার    22-09-2026    49
কিশোর গ্যাং আর সোশ্যাল মিডিয়া অপরাধের নতুন দুনিয়া

মাঝে মাঝে একটি মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। একটি মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। অপ্রতিমের মৃত্যুও তেমনই একটি ঘটনা। ১৩ বছরের একটি শিশুকে হত্যা করেছে কয়েকজন কিশোর। যে বয়সে তাদের লেখাপড়া, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে তারা কেন ঘাতক হয়ে উঠছে, কেন বিপথগামী হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন অত্যন্ত জরুরি।

অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে কিশোর গ্যাং ও সোশ্যাল মিডিয়ার যোগসূত্রের বিষয়টি সামনে আসে। মায়ের আইফোন নিয়ে অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। ১৩ বছরের একটি শিশুর হাতে কেন আইফোন তুলে দেওয়া হলো? কেন তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হলো না? শুধু অপ্রতিমের পরিবার নয়, সন্তানদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন করছি না।

বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি সহিংসতা এবং কিশোর অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি এবং অপরাধী চক্রের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। কিশোরদের একটি অংশ খুন, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও যৌন হয়রানিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও নতুন নয়। বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে উঠতি বয়সী এসব কিশোরকে ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের একটি অংশ যেমন নিজের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, তেমনি তাদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

যে বয়সে ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে কিশোরদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটাচ্ছে। ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গড়ে ওঠা ভার্চুয়াল যোগাযোগ কখনও কখনও তাদের বাস্তব জীবনের অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করছে। আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, মাদক, ইভটিজিং ও নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে আসছে।

কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইমোর মতো প্ল্যাটফর্মে গ্রুপ তৈরি করে সদস্যদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ করা হয়। ফলে কোনো এলাকায় সংঘর্ষ বা হামলার ঘটনা ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে থাকা সদস্যরা একত্রিত হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিশুদের জন্য নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতারণা, হয়রানি ও অনলাইন বুলিংয়ের পাশাপাশি ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কাও রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা শিশু-কিশোরদের আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক শিশুদের আবদার পূরণ কিংবা তাদের ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে হাতে মুঠোফোন তুলে দেন। অনেক সময় শিশুকে খাওয়ানো বা শান্ত রাখার জন্যও মোবাইল ব্যবহার করা হয়। এটি সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতার অভ্যাস তৈরি করতে পারে। পরে সেই অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে এবং অনলাইনে কী ধরনের যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, বই পড়া ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগও বাড়াতে হবে।

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, স্থানীয় অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ বিনোদন ও বিকাশের সুযোগ—সবগুলো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বয়স উপযোগী ও নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহারের বিষয়ে শিশু ও অভিভাবকদের সচেতন করা প্রয়োজন।

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়; বরং শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলাই জরুরি। যেসব দেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ ও অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেসব উদ্যোগ থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সামনে আবারও একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা আমাদের শিশুদের জন্য কেমন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি? শিশু-কিশোরদের যেমন অপরাধের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে, তেমনি তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও রাষ্ট্র—সবার।

এক মুহূর্ত দেরি না করে শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও সুস্থ সামাজিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা এবং তাদের ঘাতক হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তমত-এর আরও খবর