রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় যোগদান করি। আমার কর্মস্থল ছিল খুলনা জেলায়। সংস্থাটির কার্যক্রমের মধ্যে এইচআইভি/এইডসসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা অন্যতম কাজ ছিল। আমার দায়িত্ব পড়ে দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের পশুর নদীর তীরে অবস্থিত যৌনপল্লির যৌনকর্মী ও তাঁদের সন্তানদের নিয়ে কাজ করার।
মোংলা সমুদ্রবন্দরের বিপরীতে অবস্থিত বানিশান্তা যৌনপল্লিটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি জনপদ। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালের দিকে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক নাবিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনাকে ঘিরে এখানে যৌনপল্লিটি গড়ে ওঠে। একসময় এখানে এক হাজারের বেশি যৌনকর্মী বসবাস করতেন বলে জানা যায়। নদীভাঙন ও নানা সামাজিক বাস্তবতায় সেই সংখ্যা কমে এসেছে।
নতুন কর্মস্থল, নতুন অভিজ্ঞতা
এর আগে কখনো কোনো যৌনপল্লিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। চাকরির প্রয়োজনে প্রথমবার সেখানে গিয়ে যৌনকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শুরুতে বেশ অস্বস্তি ও ভয় অনুভব করতাম। তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারতাম না। ফলে কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়, যা আমার কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদনেও প্রতিফলিত হয়।
বিষয়টি বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে ঢাকায় এক মাসের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেন। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মস্থলে ফিরে নতুনভাবে কাজ শুরু করি। এবার যৌনকর্মীদের সঙ্গে মিশতে আর তেমন অসুবিধা হলো না। তাঁদের সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল আন্তরিক সম্পর্ক। কাজের অগ্রগতিও বাড়তে লাগল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমার কাজে সন্তুষ্ট হলেন।
কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, মুখে হাসি থাকলেও অনেকের অন্তরে জমে আছে অসীম কষ্ট। তাঁদের জীবনের গল্প শুনতে শুনতে একসময় আমার মনে সেই পেশার প্রতি তীব্র বিরূপতা তৈরি হলো। ভাবলাম, এই কাজ আর করব না। এমনকি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেললাম।
আমার সিদ্ধান্তের কথা প্রকল্প ব্যবস্থাপককে জানালে তিনি কারণ জানতে চাইলেন। আমি মনের কথাগুলো খুলে বললাম। সব শুনে তিনি আমাকে বললেন, “পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করো।”
তিনি বুঝিয়ে বললেন, যৌনকর্মীরাও আমাদের সমাজেরই অংশ। তাঁদের অনেকেই নানা প্রতিকূলতা, অসহায়ত্ব ও পরিস্থিতির চাপে এই পেশায় এসেছেন। তাঁরাও আমাদের মতো মানুষ, তাঁদেরও আছে অনুভূতি, স্বপ্ন ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
প্রকল্প ব্যবস্থাপকের কথাগুলো আমার চিন্তায় গভীর পরিবর্তন আনল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, চাকরি ছাড়ব না; বরং আরও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁদের পাশে দাঁড়াব।
মোহনার সঙ্গে পরিচয়
আমার কাজ ছিল কাউন্সেলিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে যৌনকর্মীদের বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে জানানো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে উদ্বুদ্ধ করা। এ উদ্দেশ্যে আমি ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করি। কমিটির মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। পাশাপাশি তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে নিয়মিত পরামর্শ দিতাম।
এভাবেই তাঁদের সঙ্গে আমার একটি আন্তরিক কর্মসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সময় পরিচয় হয় মোহনা নামের এক তরুণীর সঙ্গে।
মোহনার বাড়ি যশোর জেলায়। সে এসএসসি পাস করেছিল। দেখতে সুন্দরী, কথাবার্তায় নম্র এবং স্বভাবে সহজ-সরল ছিল। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে ভাইয়ের সংসারে বড় হয়েছিল সে। অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে এসএসসি পাস করেছিল।
পাশের গ্রামের রাশেদ নামের এক যুবকের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাশেদ ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করত। তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে মোহনার স্পষ্ট ধারণা ছিল না। রাশেদ তাকে একসঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মোহনার ভাই অবশ্য রাশেদকে পছন্দ করতেন না। কিন্তু প্রেমে অন্ধ মোহনা ভাইয়ের আপত্তি উপেক্ষা করে এক রাতে রাশেদের হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়।
এরপর শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়। মোহনার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে রাশেদ তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এবং একপর্যায়ে যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেয়। সরল মনে যে মানুষটিকে সে নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিল, সেই মানুষটির বিশ্বাসঘাতকতায় মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার স্বপ্ন।
যখন মোহনা বুঝতে পারে কী ঘটেছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অসহায় অবস্থায় কীভাবে বাড়ি ফিরবে, কোথায় আশ্রয় নেবে-কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না সে। একসময় আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিল। কিন্তু পরে উপলব্ধি করে, সে মারা গেলে প্রতারক রাশেদের কোনো ক্ষতি হবে না। সেই ভাবনা থেকেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই পেশায় আসতে বাধ্য হলেও মোহনা মনেপ্রাণে এখান থেকে মুক্তি পেতে চাইত। তার চোখে ছিল স্বাভাবিক, সুন্দর ও সম্মানজনক জীবন ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন। সে আমাকে বিশ্বাস করত। মাঝেমধ্যে নিজের কষ্টের কথা বলত এবং অনুরোধ করত, সম্ভব হলে যেন তাকে এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করি।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে
একদিন মোহনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কোনো হাতের কাজ জানে কি না। সে জানাল, একটি ফাউন্ডেশন থেকে হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। তার এই দক্ষতার কথা শুনে আমার মনে আশার আলো জ্বলে উঠল।
কুষ্টিয়ায় আমার এক বন্ধু বুটিকশিল্পের ব্যবসা করত। ভাবলাম, সেখানে মোহনার জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো সে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবে। তবে তাকে যৌনপল্লি থেকে বের করে আনা মোটেও সহজ ছিল না। এ জন্য প্রয়োজন ছিল পরিকল্পনা, সহযোগিতা ও অনেক প্রচেষ্টার।
আমি সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করলাম। এ কাজে বানিশান্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। অনেক চেষ্টা ও যোগাযোগের পর অবশেষে মোহনার জন্য কুষ্টিয়ায় আমার বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হই।
যেদিন মোহনাকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছে দিলাম, সেদিনের দৃশ্য আজও আমার মনে গেঁথে আছে। সে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল। কাঁদতে কাঁদতে বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিল। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি পেছনে ফেলে নতুন জীবনের পথে যাত্রা করার সুযোগ পেয়ে তার চোখের পানি যেন থামছিল না। সেই কান্নায় ছিল কষ্ট, স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মোহনা কাজে খুব আন্তরিকতা দেখায়। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সে আমার বন্ধুর আস্থা অর্জন করে। তার কাজের মান ও আগ্রহ দেখে বন্ধু তার বেতন বাড়িয়ে দেয় এবং আরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। প্রশিক্ষণের পর মোহনার দক্ষতা আরও বাড়ে। সে মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।
একদিন বন্ধু ফোন করে জানাল, মোহনা তার কাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক এবং দ্রুত উন্নতি করছে। এমন একজন প্রতিভাবান তরুণীকে তার প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ করে দিতে পেরে সে আমাকে ধন্যবাদ জানাল।
খবরটি শুনে আমার ভেতরে এক ধরনের গভীর মানসিক প্রশান্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, আমার সামান্য উদ্যোগ অন্তত একজন মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পেরেছে।
সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে মোহনার ভাইয়ের সঙ্গেও তার যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়। বোনের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে ভাইও তার পাশে এসে দাঁড়ান। এভাবেই মোহনা ধীরে ধীরে অতীতের অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যেতে থাকে।
সহমর্মিতাই পারে বদলে দিতে জীবন
মোহনার জীবনের গল্প আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে-একজন মানুষকে তার পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। মানুষের জীবনের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে এমন সব কষ্ট ও বাস্তবতা, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাই কাউকে ঘৃণা বা অবহেলা করার আগে তার অবস্থান ও অসহায়ত্ব বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আমি বিশ্বাস করি, আন্তরিক সহমর্মিতা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কাজের সুযোগ পেলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থাকা অনেক মানুষই নতুনভাবে জীবন গড়ার সাহস খুঁজে পেতে পারেন। কখনো কখনো একজন মানুষের সামান্য ইতিবাচক উদ্যোগই অন্য একজনের জীবনে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
মোহনার গল্প শুধু একজন তরুণীর অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার গল্প নয়; এটি মানবিকতা, বিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্নের গল্প।
লেখক: তানজির শাহরিয়ার
-বিএসএস (সম্মান) ও এমএসএস, সমাজকর্ম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
জীবন থেকে নেওয়া: মোহনা নামের মেয়েটি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় যোগদান করি। আমার কর্মস্থল ছিল খুলনা জেলায়। সংস্থাটির কার্যক্রমের মধ্যে এইচআইভি/এইডসসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা অন্যতম কাজ ছিল। আমার দায়িত্ব পড়ে দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের পশুর নদীর তীরে অবস্থিত যৌনপল্লির যৌনকর্মী ও তাঁদের সন্তানদের নিয়ে কাজ করার।
মোংলা সমুদ্রবন্দরের বিপরীতে অবস্থিত বানিশান্তা যৌনপল্লিটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি জনপদ। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালের দিকে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক নাবিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনাকে ঘিরে এখানে যৌনপল্লিটি গড়ে ওঠে। একসময় এখানে এক হাজারের বেশি যৌনকর্মী বসবাস করতেন বলে জানা যায়। নদীভাঙন ও নানা সামাজিক বাস্তবতায় সেই সংখ্যা কমে এসেছে।
নতুন কর্মস্থল, নতুন অভিজ্ঞতা
এর আগে কখনো কোনো যৌনপল্লিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। চাকরির প্রয়োজনে প্রথমবার সেখানে গিয়ে যৌনকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শুরুতে বেশ অস্বস্তি ও ভয় অনুভব করতাম। তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারতাম না। ফলে কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়, যা আমার কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদনেও প্রতিফলিত হয়।
বিষয়টি বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে ঢাকায় এক মাসের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেন। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মস্থলে ফিরে নতুনভাবে কাজ শুরু করি। এবার যৌনকর্মীদের সঙ্গে মিশতে আর তেমন অসুবিধা হলো না। তাঁদের সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল আন্তরিক সম্পর্ক। কাজের অগ্রগতিও বাড়তে লাগল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমার কাজে সন্তুষ্ট হলেন।
কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, মুখে হাসি থাকলেও অনেকের অন্তরে জমে আছে অসীম কষ্ট। তাঁদের জীবনের গল্প শুনতে শুনতে একসময় আমার মনে সেই পেশার প্রতি তীব্র বিরূপতা তৈরি হলো। ভাবলাম, এই কাজ আর করব না। এমনকি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেললাম।
আমার সিদ্ধান্তের কথা প্রকল্প ব্যবস্থাপককে জানালে তিনি কারণ জানতে চাইলেন। আমি মনের কথাগুলো খুলে বললাম। সব শুনে তিনি আমাকে বললেন, “পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করো।”
তিনি বুঝিয়ে বললেন, যৌনকর্মীরাও আমাদের সমাজেরই অংশ। তাঁদের অনেকেই নানা প্রতিকূলতা, অসহায়ত্ব ও পরিস্থিতির চাপে এই পেশায় এসেছেন। তাঁরাও আমাদের মতো মানুষ, তাঁদেরও আছে অনুভূতি, স্বপ্ন ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
প্রকল্প ব্যবস্থাপকের কথাগুলো আমার চিন্তায় গভীর পরিবর্তন আনল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, চাকরি ছাড়ব না; বরং আরও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁদের পাশে দাঁড়াব।
মোহনার সঙ্গে পরিচয়
আমার কাজ ছিল কাউন্সেলিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে যৌনকর্মীদের বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে জানানো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে উদ্বুদ্ধ করা। এ উদ্দেশ্যে আমি ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করি। কমিটির মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। পাশাপাশি তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে নিয়মিত পরামর্শ দিতাম।
এভাবেই তাঁদের সঙ্গে আমার একটি আন্তরিক কর্মসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সময় পরিচয় হয় মোহনা নামের এক তরুণীর সঙ্গে।
মোহনার বাড়ি যশোর জেলায়। সে এসএসসি পাস করেছিল। দেখতে সুন্দরী, কথাবার্তায় নম্র এবং স্বভাবে সহজ-সরল ছিল। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে ভাইয়ের সংসারে বড় হয়েছিল সে। অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে এসএসসি পাস করেছিল।
পাশের গ্রামের রাশেদ নামের এক যুবকের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাশেদ ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করত। তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে মোহনার স্পষ্ট ধারণা ছিল না। রাশেদ তাকে একসঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মোহনার ভাই অবশ্য রাশেদকে পছন্দ করতেন না। কিন্তু প্রেমে অন্ধ মোহনা ভাইয়ের আপত্তি উপেক্ষা করে এক রাতে রাশেদের হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়।
এরপর শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়। মোহনার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে রাশেদ তাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এবং একপর্যায়ে যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেয়। সরল মনে যে মানুষটিকে সে নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিল, সেই মানুষটির বিশ্বাসঘাতকতায় মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার স্বপ্ন।
যখন মোহনা বুঝতে পারে কী ঘটেছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অসহায় অবস্থায় কীভাবে বাড়ি ফিরবে, কোথায় আশ্রয় নেবে-কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না সে। একসময় আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিল। কিন্তু পরে উপলব্ধি করে, সে মারা গেলে প্রতারক রাশেদের কোনো ক্ষতি হবে না। সেই ভাবনা থেকেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই পেশায় আসতে বাধ্য হলেও মোহনা মনেপ্রাণে এখান থেকে মুক্তি পেতে চাইত। তার চোখে ছিল স্বাভাবিক, সুন্দর ও সম্মানজনক জীবন ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন। সে আমাকে বিশ্বাস করত। মাঝেমধ্যে নিজের কষ্টের কথা বলত এবং অনুরোধ করত, সম্ভব হলে যেন তাকে এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করি।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে
একদিন মোহনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কোনো হাতের কাজ জানে কি না। সে জানাল, একটি ফাউন্ডেশন থেকে হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। তার এই দক্ষতার কথা শুনে আমার মনে আশার আলো জ্বলে উঠল।
কুষ্টিয়ায় আমার এক বন্ধু বুটিকশিল্পের ব্যবসা করত। ভাবলাম, সেখানে মোহনার জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো সে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবে। তবে তাকে যৌনপল্লি থেকে বের করে আনা মোটেও সহজ ছিল না। এ জন্য প্রয়োজন ছিল পরিকল্পনা, সহযোগিতা ও অনেক প্রচেষ্টার।
আমি সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করলাম। এ কাজে বানিশান্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। অনেক চেষ্টা ও যোগাযোগের পর অবশেষে মোহনার জন্য কুষ্টিয়ায় আমার বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হই।
যেদিন মোহনাকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছে দিলাম, সেদিনের দৃশ্য আজও আমার মনে গেঁথে আছে। সে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করেছিল। কাঁদতে কাঁদতে বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিল। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা ও অসহায়ত্বের অনুভূতি পেছনে ফেলে নতুন জীবনের পথে যাত্রা করার সুযোগ পেয়ে তার চোখের পানি যেন থামছিল না। সেই কান্নায় ছিল কষ্ট, স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মোহনা কাজে খুব আন্তরিকতা দেখায়। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সে আমার বন্ধুর আস্থা অর্জন করে। তার কাজের মান ও আগ্রহ দেখে বন্ধু তার বেতন বাড়িয়ে দেয় এবং আরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। প্রশিক্ষণের পর মোহনার দক্ষতা আরও বাড়ে। সে মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।
একদিন বন্ধু ফোন করে জানাল, মোহনা তার কাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক এবং দ্রুত উন্নতি করছে। এমন একজন প্রতিভাবান তরুণীকে তার প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ করে দিতে পেরে সে আমাকে ধন্যবাদ জানাল।
খবরটি শুনে আমার ভেতরে এক ধরনের গভীর মানসিক প্রশান্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, আমার সামান্য উদ্যোগ অন্তত একজন মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পেরেছে।
সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে মোহনার ভাইয়ের সঙ্গেও তার যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়। বোনের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে ভাইও তার পাশে এসে দাঁড়ান। এভাবেই মোহনা ধীরে ধীরে অতীতের অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যেতে থাকে।
সহমর্মিতাই পারে বদলে দিতে জীবন
মোহনার জীবনের গল্প আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে-একজন মানুষকে তার পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। মানুষের জীবনের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে এমন সব কষ্ট ও বাস্তবতা, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাই কাউকে ঘৃণা বা অবহেলা করার আগে তার অবস্থান ও অসহায়ত্ব বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আমি বিশ্বাস করি, আন্তরিক সহমর্মিতা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কাজের সুযোগ পেলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থাকা অনেক মানুষই নতুনভাবে জীবন গড়ার সাহস খুঁজে পেতে পারেন। কখনো কখনো একজন মানুষের সামান্য ইতিবাচক উদ্যোগই অন্য একজনের জীবনে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
মোহনার গল্প শুধু একজন তরুণীর অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার গল্প নয়; এটি মানবিকতা, বিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্নের গল্প।
লেখক: তানজির শাহরিয়ার
-বিএসএস (সম্মান) ও এমএসএস, সমাজকর্ম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ জাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
আলহাজ্ব শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক
তাকছিমুন নাহার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
ইঞ্জিনিয়ার কে এম মেহেদী হাসান
|
মোবাইল: ০১৭১১২৪৯৭৭০
হোয়াটস্অ্যাপ: ০১৭১১২৪৯৭৭০
প্রধান কার্যালয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
Email: deshpatrika24@gmail.com |
প্রিন্টের তারিখ ও সময়: October 17, 2026, 4:40 am