ভারত এর কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত চাইল বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ ‘সমাধান করা যাবে না এমন কোনো ইস্যু নেই’: ত্রিবেদী

  বিশেষ প্রতিনিধি    11-08-2026    15
ভারত এর কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত চাইল বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করেছে, ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করবে। এ সময় ভারতীয় হাইকমিশনার ঢাকায় দায়িত্ব পালনের গত দুই মাসের অভিজ্ঞতাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ সাক্ষাতের বিষয়টি জানানো হয়।

জুনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এটিই দিনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সাক্ষাৎ। এর আগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও স্বার্থ সমুন্নত রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি একে অন্যের সংবেদনশীলতার প্রতিও যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।

সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অতীতের বিষয়গুলো পেছনে ফেলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা প্রয়োজন।

গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বা বিভিন্ন ইস্যু থাকা স্বাভাবিক। তবে আলোচনা ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করা যাবে না—এমন কোনো জটিল ইস্যু নেই।

ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু ভৌগোলিক সীমানাই ভাগাভাগি করে না, বরং দুই দেশের জনগণ সমৃদ্ধির স্বপ্নও ভাগাভাগি করে। সব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা একটি শক্তিশালী ও পারস্পরিক কল্যাণকর সম্পর্ক গড়ে তোলা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য ভারতকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে এবং বিদ্যমান বিষয়গুলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

হাসিনা ও ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরত চাওয়া

বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্যমান বন্দিবিনিময় ও প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত চিহ্নিত পলাতক আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানান। পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়।

জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, বিষয়গুলো আইনগতভাবে পর্যালোচনা করে ভারতের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের দিন একটি চিঠির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

খলিলুর রহমান বলেন, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ। এ ধরনের বৈঠকে সাধারণত চুক্তি বা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় না।

এসডিজি বাস্তবায়নে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘদিনের শাসন ও অর্থনৈতিক সংকটের পর বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের সময় এসেছে। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণ বিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এসডিজির মূলনীতি ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এবং বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমূলক নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা, জলবায়ু সহনশীলতা ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলোকে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন’ বা তিন স্তরের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি স্পোর্টস কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পর্যায়ক্রমে দেশের সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিন গ্রামে ‘এসডিজি ভিলেজ’ পাইলট কার্যক্রম

প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের আওতায় রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগরকে প্রাথমিকভাবে পাইলট মডেল হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মানবিক রাষ্ট্র ও কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, সর্বজনীন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

জাতীয়-এর আরও খবর