রাত গড়ালেই মদ-মাংসের আসর, তৃণমূল যুবনেতার বাগানবাড়িতে বুলডোজার অভিযান

  বিশেষ প্রতিনিধি    27-06-2026    88
রাত গড়ালেই মদ-মাংসের আসর, তৃণমূল যুবনেতার বাগানবাড়িতে বুলডোজার অভিযান

পাঁচিল ঘেরা এলাকা, মূল ফটকে বড় অক্ষরে লেখা ছিল— “বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ”। সামনে খোলা জায়গা পেরিয়ে ভেতরে সুসজ্জিত বাগানবাড়ি। দেখে মনে হতে পারে কোনো বিত্তশালী ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবকাশযাপন কেন্দ্র। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি ছিল তৃণমূল যুব সভাপতি পাপাই ঘোষের বাগানবাড়ি, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছিল।

রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন পাপাই ঘোষ। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বাগানবাড়িটি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ তুলে আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতের নির্দেশনার পর শনিবার সকালে প্রশাসন সেখানে বুলডোজার অভিযান চালিয়ে স্থাপনাটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

বহরমপুর পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দাবাদের সুড়সুড়ি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ওই বাগানবাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই অভিযুক্ত পাপাই ঘোষ এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং স্থানীয়দের নানা সমস্যার সমাধানের নামে প্রভাব বিস্তার করতেন। এমনকি কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রয়োজন হলেও তাকে ওই বাগানবাড়িতে ডেকে পাঠানো হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে পাপাই ঘোষের ঘনিষ্ঠদের আনাগোনা লেগেই থাকত। প্রায় প্রতিরাতে সেখানে চলত পিকনিক, মদ্যপান ও ভোজের আয়োজন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, রাতের বেলায় আশপাশের বাসিন্দারা, বিশেষ করে নারীরা, ওই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে ভয় পেতেন।

পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, জমিটির প্রকৃত মালিক হাওড়া এলাকার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। কংগ্রেস পরিচালিত পুরবোর্ড ওই স্থানের একটি অংশে শিশুদের জন্য একটি শিশু উদ্যান গড়ে তোলে। তবে অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে বহরমপুর পুরসভা তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে আসার পর জমিটির বাকি অংশ জাল দলিলের মাধ্যমে পাপাই ঘোষ নিজের দখলে নেন এবং সেখানে বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থে মামলা দায়ের করেন। মামলার রায় এলাকাবাসীর পক্ষে গেলে প্রশাসন শনিবার সেখানে বুলডোজার নিয়ে গিয়ে পুরো স্থাপনাটি ভেঙে ফেলে।

এ বিষয়ে পাপাই ঘোষের মা চম্পা ঘোষ দাবি করেন, “আমার ছেলে এখন কোথায় আছে, সেটা আমি জানি না। তবে এই জমিতে আমাদের একটি বাড়ি ছিল এবং আমাদের কাছে বৈধ দলিল রয়েছে। আদালতেও তা দেখানো হয়েছিল। আজ শুনলাম বাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, অথচ আমাদের কিছু জানানো হয়নি।”

ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বিজেপির বহরমপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি মলয় মহাজন বলেন, “অবৈধ দখলদারি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। প্রশাসন এখন সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করেছে। আজ পাপাই ঘোষের বাগানবাড়ি ভাঙা হয়েছে, আগামী দিনে যারা এভাবে সরকারি বা অন্যের জমি দখল করে রেখেছে, তারাও ছাড় পাবে না।”

অন্যদিকে বহরমপুর পুরসভার বিরোধী দলনেতা ও কংগ্রেস কাউন্সিলর হিরু হালদার বলেন, “এটি খুব ছোট একটি ঘটনা। এই তৃণমূল যুব সভাপতির নেতৃত্বে একাধিক সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি পার্ক ও সুইমিং পুল অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যা এখন গোডাউনে পরিণত হয়েছে। আমি চাই সেই পার্কসহ সব সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা হোক।”

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহরমপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের এই অভিযানের পর এখন নজর রয়েছে, অভিযোগ ওঠা অন্যান্য অবৈধ দখল ও সম্পত্তির বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।

আন্তর্জাতিক-এর আরও খবর