ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপিং! ২৩ শট ঠেকিয়ে ইরানের মহা-নায়ক বেইরানভান্দ

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     22-06-2026    44
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপিং! ২৩ শট ঠেকিয়ে ইরানের মহা-নায়ক বেইরানভান্দ

ম্যাচের শুরুতেই প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারের শক্তিশালী আঘাতে বুকে চোট পেয়ে কিছুক্ষণ মাঠেই নিথর হয়ে পড়ে ছিলেন তিনি। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো আর ম্যাচে ফেরা হবে না। কিন্তু সেই চোট, ব্যথা আর শারীরিক অস্বস্তিকে উপেক্ষা করে ৩৩ বছর বয়সী ইরানি গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ যা করলেন, তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুদিন।

ক্যালিফোর্নিয়ার সোফি স্টেডিয়ামে তার অবিশ্বাস্য গোলকিপিং নৈপুণ্যে তারকাখচিত বেলজিয়ামের একের পর এক আক্রমণ ব্যর্থ করে ইরানকে এনে দেন অত্যন্ত মূল্যবান এক পয়েন্ট। বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপের বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য (০-০) ড্রয়ে শেষ হলেও ম্যাচের আসল আলোচনায় ছিলেন একজনই— আলিরেজা বেইরানভান্দ। অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তিনিই জিতে নেন ম্যাচসেরার (ম্যান অব দ্য ম্যাচ) পুরস্কার।

চোট দিয়েই শুরু, এরপর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে বেলজিয়াম। শুরুর দিকেই প্রতিপক্ষের বিপজ্জনক একটি আক্রমণ ঠেকাতে এগিয়ে আসেন বেইরানভান্দ। ঠিক সেই মুহূর্তে বেলজিয়ামের স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকুর বুট সজোরে আঘাত করে তার বুকে। প্রচণ্ড ব্যথায় মাঠে পড়ে যান ইরানের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। কয়েক মিনিট চিকিৎসা নেওয়ার পর আবার মাঠে ফেরেন তিনি। আর এরপরই যেন বদলে যায় পুরো ম্যাচের গল্প।

একাই সামলালেন ২৩ শটের ঝড়

পুরো ম্যাচে প্রায় ৭০ শতাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রেখেছিল বেলজিয়াম। গোলমুখে নেয় মোট ২৩টি শট। এর মধ্যে লক্ষ্যে থাকা ৭টি শটই ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা আর দুর্দান্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে প্রতিটি শটই ঠেকিয়ে দেন বেইরানভান্দ।

ম্যাচের ১১ মিনিটে বেলজিয়ামের শক্তিশালী শট ঝাঁপিয়ে প্রতিহত করা, প্রথমার্ধের শেষ দিকে নিশ্চিত গোল হতে যাওয়া একটি ভলি রুখে দেওয়া এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬০ মিনিটে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেও এক হাতে নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেওয়া— প্রতিটি মুহূর্তই ছিল বিশ্বমানের গোলকিপিংয়ের অনন্য উদাহরণ।

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মাত্র চার মিনিট আগে আবারও বেলজিয়ামের জোরালো শট দুর্দান্তভাবে আটকে দিয়ে ইরানের ‘ক্লিন শিট’ নিশ্চিত করেন তিনি। শুধু গোল বাঁচানো নয়, পুরো ম্যাচে ১১টি নিখুঁত লং বল এবং ৩টি গুরুত্বপূর্ণ হাই-ক্লেইম করে রক্ষণভাগেও এনে দেন বাড়তি আত্মবিশ্বাস।

দুই গোলরক্ষকের লড়াই, বেলজিয়ামের লাল কার্ড

যদিও ম্যাচে শুধু বেইরানভান্দ নন, বেলজিয়ামের গোলরক্ষকও ছিলেন সমান সতর্ক। ইরানের তারকা ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমির দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ দারুণভাবে প্রতিহত করেন তিনি।

প্রথমার্ধের ২৫ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে তারেমি বল জালে পাঠালেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সিদ্ধান্তে অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়।

ম্যাচের ৬৬ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় বেলজিয়াম। নিজেদের রক্ষণভাগে ভুল পাস থেকে বল পেয়ে যান মেহদি তারেমি। তাকে গোলের সুযোগ থেকে আটকাতে পেছন থেকে ফাউল করেন বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার। সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। এরপর প্রায় আধাঘণ্টা ১০ জনের দল নিয়ে খেলতে হলেও শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দলটি।

জমে উঠেছে ‘জি’ গ্রুপের সমীকরণ

চলতি বিশ্বকাপে আগের ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে ড্র করার পর এটি বেলজিয়ামের টানা দ্বিতীয় ড্র। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ চার ম্যাচে এখনও জয়ের দেখা পায়নি তারা।

অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র করার পর এবার শক্তিশালী বেলজিয়ামকে রুখে দিয়ে দুই ম্যাচে দুই পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে ‘জি’ গ্রুপের শীর্ষে উঠে এসেছে ইরান। সমান দুই পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বেলজিয়াম। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড ও মিসরের সংগ্রহ এক পয়েন্ট করে।

আগামী শনিবার গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে বেলজিয়াম মুখোমুখি হবে নিউজিল্যান্ডের এবং ইরান খেলবে মিসরের বিপক্ষে।

ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে ইরান

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কখনও নকআউট পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি ইরান। তবে এবার সেই স্বপ্ন পূরণের দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের সামনে। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখন একটাই— আলিরেজা বেইরানভান্দ।

চোট পেয়েও যেভাবে তিনি ২৩টি আক্রমণের সামনে একাই দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তা শুধু একটি ম্যাচ বাঁচানোর গল্প নয়— এটি সাহস, লড়াই এবং বিশ্বমানের গোলকিপিংয়ের এক অনন্য অধ্যায়, যা ফুটবলপ্রেমীরা দীর্ঘদিন মনে রাখবে।

খেলাধুলা-এর আরও খবর