জাপানের ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাশা, ২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     28-10-2026    4
জাপানের ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাশা, ২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ও জাপান। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৩১ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের জরুরি ঋণ সহায়তা দিচ্ছে জাপান। টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কানতেইয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ১৪ দফা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

বিগ-বি উদ্যোগ সম্প্রসারণ

দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে ‘বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল’ বা বিগ-বি উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ হিসেবে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে কাজ করবে দুই দেশ। এ ছাড়া ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, মেট্রোরেল নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান।

জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি। গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রস্তাবিত এই পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকার

বৈঠকে জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ স্থানান্তর ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি খাদ্য, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ওষুধশিল্পে বিনিয়োগ এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তিতে যোগদানের বিষয়েও আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান।

চারটি সমঝোতা স্মারক সই

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক ও সম্মতিপত্র সই হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ ছাড়া খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশের কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার জন্য জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সম্মতিপত্র সই হয়।

প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের উন্নয়ন সহায়তায় একটি টহলজাহাজ এবং নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেওয়ার বিষয়টিও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় দুই প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের জন্য নির্বিঘ্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, গাজা পুনর্গঠন এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে দুই দেশ।

জাপানের জ্বালানি ও লজিস্টিকস অবকাঠামো পরিদর্শন

সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে অবস্থিত জেরা পরিচালিত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। পরে ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে জাপানি প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়াই এসব পরিদর্শনের উদ্দেশ্য বলে জানা গেছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয়-এর আরও খবর