চলতি বছরের অক্টোবর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৩৩৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনির ৩৩টি ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। আর মব সহিংসতার ২২টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন, আহত হয়েছেন ৩৬ জন। এ ছাড়া মাসজুড়ে কারাগারে ১৯ বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
অক্টোবর মাসে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৬ জন সাংবাদিক। নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৬১ জন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অক্টোবর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সংগঠনটি। এতে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১২, আহত ৩৩৪
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, অক্টোবরে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৩৩৪ জন আহত হয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবরে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে, তবে আহতের সংখ্যা কমেছে। সেপ্টেম্বরে ৬৮টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৫২৭ জন আহত হয়েছিলেন।
অক্টোবরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৫টি ঘটনায় অন্তত ১৮৫ জন আহত এবং নয়জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষে ২৭ জন আহত ও দুজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একটি ঘটনায় একজন আহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে দুটি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন তিনজন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১১টি সংঘর্ষে ৩৩ জন এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে আটটি সংঘর্ষে ৭০ জন আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১২ জনের মধ্যে বিএনপির ১০ জন এবং আওয়ামী লীগের দুজন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ছয়টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চারটি ঘটনায় ৩১ জন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে অন্য দুটি ঘটনায় আহত হয়েছেন চারজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
দুর্বৃত্তদের হামলায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হতাহতের অন্তত ১১টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির দুজন, আওয়ামী লীগের চারজন এবং একজন চরমপন্থি রয়েছেন। এ মাসে অন্তত ৩১ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে অন্তত ২২টি ঘটনায় ৭০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, সংঘর্ষ, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
অক্টোবর মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২০২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় ৩১৫ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক, যৌথ অভিযান ও বিশেষ অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অন্তত ২৫ হাজার ১৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩৮৪ জন, বিএনপির ৮১ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২৭ জন, এনসিপির একজন এবং উগ্রপন্থি ও চরমপন্থি সংগঠনের ১৮ জন সদস্য রয়েছেন।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা
অক্টোবরে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে গণপিটুনির ৩৩টি ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে মব সহিংসতার ২২টি ঘটনায় ৩৬ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন।
মব সহিংসতার ঘটনায় দুজনকে হেনস্তা, ছয়জন পুলিশ সদস্যকে আহত, সাতটি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং চারটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
অক্টোবর মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের অন্তত ২৮টি ঘটনায় ৪৬ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় একজন সাংবাদিক নিহত, অন্তত ৩১ জন আহত, সাতজন লাঞ্ছিত এবং ছয়জন হুমকির মুখে পড়েছেন। সংবাদ প্রকাশের জেরে মানহানির অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে নয়টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ১০৮ জন আহত, চারজন গুলিবিদ্ধ এবং ৩১ জন আটক হয়েছেন।
এ ছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ১৫টি ঘটনায় ২০ জনকে আটক এবং ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনার জেরে দুটি ঘটনায় তিনজনকে আটক ও দুটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক বিষয়ে সমালোচনার কারণে চারজন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে পাঁচজন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।
জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জেরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একজনকে পিটিয়ে হত্যা, তিনজনকে নির্যাতন এবং একজনকে সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা একটি মামলায় একজনকে আটক এবং দুজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কারাগারে ১৯ বন্দির মৃত্যু
অক্টোবর মাসে সারাদেশের কারাগারে অন্তত ১৯ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন কয়েদি এবং ১৫ জন হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের দুজন এবং বাকি ১৭ জন সাধারণ বন্দি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনজনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন।
আটক এড়াতে জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশ দেখে দৌড়ে পালানোর ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মামলার তদন্তে বাসায় অভিযানের সময় আতঙ্কিত হয়ে স্ট্রোক করে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৫৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। অক্টোবর মাসে এ ধরনের ৫৩টি ঘটনায় মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ছিল বস্তাবন্দি, চারটি ঝুলন্ত অবস্থায় এবং সাতটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ছাড়া গলাকাটা অবস্থায় সাতটি, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চারটি এবং অন্যান্য পরিস্থিতিতে আরও ২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটক
অক্টোবর মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তিনটি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় একজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। আহত দুজনই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ সময়ে দুজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় আরও দুজনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের এক যুবক আহত হয়েছেন।
শ্রমিক, নারী ও শিশু নির্যাতন
অক্টোবর মাসে অন্তত ৭১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং কমপক্ষে ১৩৪ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন।
এ ছাড়া পৃথক তিনটি ঘটনায় একজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং তিনজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন শিশু বা কিশোরী। অন্যদিকে চারজন গৃহকর্মীর মধ্যে দুজন ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অক্টোবর মাসে ২৬১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৮২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৪২ জন, অর্থাৎ ৫১ শতাংশ, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে পাঁচজনকে, তাঁদের মধ্যে একজন শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণের কারণে একজন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
অন্যদিকে ৭২ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৬ জনই শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন নয়জন এবং আহত হয়েছেন দুজন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে ৪৭ জন নারী নিহত, ২৬ জন আহত এবং ২১ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া দাহ্য পদার্থ ও অ্যাসিড নিক্ষেপের মাধ্যমে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এ মাসে ২০১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১৬৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরএসএসের উদ্বেগ
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। তিনি বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, কারাগারে মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অক্টোবরে গণপিটুনি, মব ও রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৩৫: এইচআরএসএস
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৩৩৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনির ৩৩টি ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। আর মব সহিংসতার ২২টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন, আহত হয়েছেন ৩৬ জন। এ ছাড়া মাসজুড়ে কারাগারে ১৯ বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
অক্টোবর মাসে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৬ জন সাংবাদিক। নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৬১ জন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অক্টোবর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সংগঠনটি। এতে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১২, আহত ৩৩৪
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, অক্টোবরে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৩৩৪ জন আহত হয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবরে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে, তবে আহতের সংখ্যা কমেছে। সেপ্টেম্বরে ৬৮টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৫২৭ জন আহত হয়েছিলেন।
অক্টোবরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৫টি ঘটনায় অন্তত ১৮৫ জন আহত এবং নয়জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষে ২৭ জন আহত ও দুজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একটি ঘটনায় একজন আহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে দুটি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন তিনজন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১১টি সংঘর্ষে ৩৩ জন এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে আটটি সংঘর্ষে ৭০ জন আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১২ জনের মধ্যে বিএনপির ১০ জন এবং আওয়ামী লীগের দুজন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ছয়টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চারটি ঘটনায় ৩১ জন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে অন্য দুটি ঘটনায় আহত হয়েছেন চারজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
দুর্বৃত্তদের হামলায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হতাহতের অন্তত ১১টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির দুজন, আওয়ামী লীগের চারজন এবং একজন চরমপন্থি রয়েছেন। এ মাসে অন্তত ৩১ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে অন্তত ২২টি ঘটনায় ৭০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, সংঘর্ষ, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
অক্টোবর মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২০২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় ৩১৫ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক, যৌথ অভিযান ও বিশেষ অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অন্তত ২৫ হাজার ১৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩৮৪ জন, বিএনপির ৮১ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২৭ জন, এনসিপির একজন এবং উগ্রপন্থি ও চরমপন্থি সংগঠনের ১৮ জন সদস্য রয়েছেন।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা
অক্টোবরে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে গণপিটুনির ৩৩টি ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে মব সহিংসতার ২২টি ঘটনায় ৩৬ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন।
মব সহিংসতার ঘটনায় দুজনকে হেনস্তা, ছয়জন পুলিশ সদস্যকে আহত, সাতটি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং চারটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
অক্টোবর মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের অন্তত ২৮টি ঘটনায় ৪৬ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় একজন সাংবাদিক নিহত, অন্তত ৩১ জন আহত, সাতজন লাঞ্ছিত এবং ছয়জন হুমকির মুখে পড়েছেন। সংবাদ প্রকাশের জেরে মানহানির অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে নয়টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ১০৮ জন আহত, চারজন গুলিবিদ্ধ এবং ৩১ জন আটক হয়েছেন।
এ ছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ১৫টি ঘটনায় ২০ জনকে আটক এবং ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনার জেরে দুটি ঘটনায় তিনজনকে আটক ও দুটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক বিষয়ে সমালোচনার কারণে চারজন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে পাঁচজন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।
জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জেরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একজনকে পিটিয়ে হত্যা, তিনজনকে নির্যাতন এবং একজনকে সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা একটি মামলায় একজনকে আটক এবং দুজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কারাগারে ১৯ বন্দির মৃত্যু
অক্টোবর মাসে সারাদেশের কারাগারে অন্তত ১৯ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন কয়েদি এবং ১৫ জন হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের দুজন এবং বাকি ১৭ জন সাধারণ বন্দি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনজনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন।
আটক এড়াতে জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশ দেখে দৌড়ে পালানোর ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মামলার তদন্তে বাসায় অভিযানের সময় আতঙ্কিত হয়ে স্ট্রোক করে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৫৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। অক্টোবর মাসে এ ধরনের ৫৩টি ঘটনায় মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ছিল বস্তাবন্দি, চারটি ঝুলন্ত অবস্থায় এবং সাতটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ছাড়া গলাকাটা অবস্থায় সাতটি, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চারটি এবং অন্যান্য পরিস্থিতিতে আরও ২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটক
অক্টোবর মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তিনটি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় একজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। আহত দুজনই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ সময়ে দুজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় আরও দুজনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের এক যুবক আহত হয়েছেন।
শ্রমিক, নারী ও শিশু নির্যাতন
অক্টোবর মাসে অন্তত ৭১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং কমপক্ষে ১৩৪ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন।
এ ছাড়া পৃথক তিনটি ঘটনায় একজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং তিনজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন শিশু বা কিশোরী। অন্যদিকে চারজন গৃহকর্মীর মধ্যে দুজন ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অক্টোবর মাসে ২৬১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৮২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৪২ জন, অর্থাৎ ৫১ শতাংশ, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে পাঁচজনকে, তাঁদের মধ্যে একজন শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণের কারণে একজন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
অন্যদিকে ৭২ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৬ জনই শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন নয়জন এবং আহত হয়েছেন দুজন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে ৪৭ জন নারী নিহত, ২৬ জন আহত এবং ২১ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া দাহ্য পদার্থ ও অ্যাসিড নিক্ষেপের মাধ্যমে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এ মাসে ২০১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১৬৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরএসএসের উদ্বেগ
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। তিনি বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, কারাগারে মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ জাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক
আলহাজ্ব শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক
তাকছিমুন নাহার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
ইঞ্জিনিয়ার কে এম মেহেদী হাসান
|
মোবাইল: ০১৭১১২৪৯৭৭০
হোয়াটস্অ্যাপ: ০১৭১১২৪৯৭৭০
প্রধান কার্যালয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
Email: deshpatrika24@gmail.com |
প্রিন্টের তারিখ ও সময়: November 4, 2026, 10:01 am