এনআইডি সংশোধনে নানা জটিলতা, ঝুলে আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার আবেদন

চ্যালেঞ্জের মুখে নির্বাচন কমিশন ► ভোগান্তিতে নাগরিকরা

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     05-11-2026    19
এনআইডি সংশোধনে নানা জটিলতা, ঝুলে আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার আবেদন

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধন নিয়ে নানা জটিলতায় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ঝুলে আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি আবেদন। নাগরিকদের ভুল তথ্য, ভুয়া কাগজপত্র, তথ্যের অসংগতি, একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদ, বাস্তবতার সঙ্গে সংশোধন চাওয়া তথ্যের মিল না থাকা, পাসপোর্টসংক্রান্ত জটিলতা, প্রবাসীদের বয়স পরিবর্তনের আবেদন এবং দত্তক গ্রহণসংক্রান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ইসির কর্মকর্তারা। এতে একদিকে নির্বাচন কমিশন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে বছরের পর বছর আবেদন ঝুলে থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন নাগরিকরা।

এদিকে এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি প্রতারক চক্র। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে চক্রটি এনআইডি সংশোধনের নামে প্রতারণা এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বেচাকেনার কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, গত ৩ নভেম্বর পর্যন্ত কমিশনে ছয়টি ক্যাটাগরিতে মোট ৬৬ লাখ ১২ হাজার ৪৩৩টি সংশোধনের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৮৯টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪টি আবেদন এখনো অনিষ্পন্ন। এসব আবেদনের প্রায় ৯২ শতাংশই চলতি বছরের। অনিষ্পন্ন আবেদনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৩ হাজার ৩৭২টি ‘ঘ’ ক্যাটাগরির। এ ক্যাটাগরিতে নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। এসব আবেদনের ক্ষেত্রে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালকের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

নির্বাচন কমিশন এনআইডি সংশোধনের আবেদনগুলোকে ‘ক’, ‘ক-১’, ‘খ’, ‘খ-১’, ‘গ’ ও ‘ঘ’—এই ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। এর মধ্যে ‘ক’ ক্যাটাগরিতে নামের বানানসহ ছোটখাটো ভুল সংশোধন করা হয়। ‘খ’ ক্যাটাগরিতে ছবি, স্বাক্ষর ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তনের আবেদন থাকে। ‘গ’ ক্যাটাগরিতে নাম কিংবা বাবা-মায়ের নামের বড় ধরনের পরিবর্তন করা হয়। আর ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে জন্মতারিখ, বয়স এবং বাবা-মায়ের নামসংক্রান্ত তথ্য সংশোধনের আবেদন অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া ‘ক-১’ ও ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতে ছোটখাটো বানান ও তথ্যগত ভুল সংশোধন করা হয়।

বর্তমানে অনিষ্পন্ন আবেদনের মধ্যে ‘ঘ’ ক্যাটাগরির পর সবচেয়ে বেশি আবেদন জমে আছে ‘খ’ ক্যাটাগরিতে—২১ হাজার ৩২৮টি। এ ছাড়া ‘ক’ ক্যাটাগরিতে ১৯ হাজার ৪৪টি, ‘গ’ ক্যাটাগরিতে ১৬ হাজার ৮১৫টি, ‘খ-১’ ক্যাটাগরিতে ৪ হাজার ৬০৭টি এবং ‘ক-১’ ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৭৮টি আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে।

এ বিষয়ে এনআইডি শাখার একজন পরিচালক বলেন, নানা ধরনের জটিলতার কারণেই এনআইডি সংশোধনের আবেদনগুলো ঝুলে আছে। প্রতিটি আবেদনের পেছনেই আলাদা ঘটনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বয়স সংশোধনের আবেদনের সঙ্গে পারিবারিক তথ্য ও ওয়ারিশ সনদের অসংগতি পাওয়া যায়। কোথাও ভাই-বোনের জন্মতারিখের ব্যবধান মাত্র ছয়-সাত মাস। আবার কারও সংশোধনের আবেদন অনুযায়ী ভোটার হওয়ার সময় তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র সাত বা আট বছর।

তিনি আরও বলেন, অনেক আবেদনকারী এনআইডির তথ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন চান। তাঁদের মধ্যে কারও কারও অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। আবার এনআইডিতে নাম পরিবর্তন করে জমি দখল কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

দেশজুড়ে সক্রিয় এনআইডি জালিয়াতির চক্র

এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে একটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে তারা সংশোধনের নামে প্রতারণা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে। এতে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ ও বেচাকেনার ঘটনাও সামনে এসেছে।

গত ১৫ জানুয়ারি জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি এবং নাগরিকদের গোপনীয় তথ্য অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, নাগরিকদের তথ্য বেচাকেনার মাধ্যমে তাঁরা প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি লেনদেন করতেন।

জানা গেছে, দেশের ১৮ লাখেরও বেশি নাগরিকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ ‘সাইবারস্টেশন’। দেশের ১৫টি খাতের ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করে প্রায় সবকটির ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইসির এক কর্মকর্তা জানান, এনআইডি সার্ভারের তথ্য অনৈতিকভাবে সংশোধন ও স্থানান্তরের জন্য ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সরবরাহ করা হতো। এর বিনিময়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হতো। ওই গ্রুপের মাধ্যমে তথ্যগুলো আবার বিভিন্ন কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে সরবরাহ করা হতো। এভাবেই চলত অবৈধ লেনদেনের কার্যক্রম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচন কমিশন নাগরিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয়-এর আরও খবর