তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মফস্বলের জনজীবন বাড়তি লোড চায় পল্লী বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকটে বাড়ানো যাচ্ছে না উৎপাদন

  বিশেষ প্রতিনিধি    29-06-2026    69
তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মফস্বলের জনজীবন বাড়তি লোড চায় পল্লী বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকটে বাড়ানো যাচ্ছে না উৎপাদন

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বর্তমানে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বলে প্রাক্কলন করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এর বিপরীতে পিক আওয়ারে, অর্থাৎ সন্ধ্যার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকছে সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি।

চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধানের কারণে অন্তত আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে রাতের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক অঞ্চলের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুতের বাড়তি লোড চেয়ে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিকে চিঠি দিয়েছে।

তবে এই পরিস্থিতির জন্য শুধু বিশ্বকাপ নয়, মূল কারণ গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহ। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এ অবস্থা চলছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকার অন্যতম কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস নেই, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে বকেয়া বিল ও জ্বালানি আমদানিতে অর্থসংকট। ফলে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিপিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বলেন, “লোডশেডিং কমাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে পেট্রোবাংলার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা কিছুটা সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। আমাদের উৎপাদন অনুযায়ী শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও মফস্বলের কিছু অঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে। উৎপাদন বাড়লে কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

গত শনিবার সন্ধ্যার পিক আওয়ারে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ওঠে ১৭ হাজার ৬২৫ মেগাওয়াটে। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ওইদিন উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট। সে হিসাবে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯৭৫ মেগাওয়াট। তবে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৭৪ মেগাওয়াট।

সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৫৩৮ মেগাওয়াট। এরপর ময়মনসিংহে ৫১৯, খুলনায় ৩৭৫, রাজশাহীতে ৩৫২, কুমিল্লায় ৩৪৩, সিলেটে ২৪৭, রংপুরে ১৯৬, চট্টগ্রামে ১৬২ এবং বরিশালে ১৪২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মফস্বলের মানুষ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পোলট্রি খাতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ডিম ও মাংস উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, দিনে জেলার চাহিদা ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ মিলছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা বেড়ে ১৩০ মেগাওয়াট ছাড়ালেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। ফলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

নাটোর সদর উপজেলার শিবদুর গ্রামের বাসিন্দা রিজভী আহমেদ বলেন, “দিন-রাত মিলিয়ে মাত্র ৮ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাই। রাতের বেলায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়।”

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার ফখরুল আলম বলেন, “তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিনে-রাতে লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছি। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বরাদ্দের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”

মাগুরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকাতেও একই চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গ্রাম ঘুল্লিয়ার কলেজছাত্র সুজন মোল্লা বলেন, “গরম বাড়লেই লোডশেডিং বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর আধাঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের এক ঘণ্টা থাকে না।”

অসহনীয় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভাগের অনিয়মের অভিযোগে টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি এবং ঢাকার দোহারে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিশ্বকাপ খেলা দেখতে না পেরে বিদ্যুৎ অফিসে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটি ও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল আবহাওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।

মন্ত্রী বলেন, “একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারে লিকেজ দেখা দেওয়ায় সেটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল আবহাওয়ার কারণে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে ওই কেন্দ্রের একটি ইউনিটও বন্ধ রয়েছে। এই দুই কারণে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। এর প্রভাবেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে এবং ঢাকাতেও লোডশেডিং করতে হবে।”

তীব্র গরম, জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ঘাটতির এই ত্রিমুখী চাপের কারণে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো না গেলে মফস্বল অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

জাতীয়-এর আরও খবর