যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার হুমকি, আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি নিচ্ছে ইরান-নতুন করে আবার যুদ্ধের আশঙ্কা

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     24-10-2026    11
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার হুমকি, আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি নিচ্ছে ইরান-নতুন করে আবার যুদ্ধের আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এবার শুধু পাল্টা আঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ইরান; প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও সামরিক অভিযান চালাবে। হামলায় ব্যবহৃত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। নিজেদের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়ে এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

গত বুধবার ইরানের এ ঘোষণা আসে। এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার মধ্যে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন, এমন মার্কিন কূটনৈতিক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব থেকে সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলমান সংঘাত নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা স্থবির হয়ে থাকায় এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের নতুন সামরিক নীতিতে কী আছে

বুধবার আইআরজিসি তাদের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। নতুন নীতিকে তারা বলছে ‘আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক’। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষের হামলার জবাবে শুধু পাল্টা আঘাত নয়, বরং আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রাখবে ইরান।

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘আগে আমাদের প্রতিরক্ষানীতি ছিল আত্মরক্ষামূলক। আমরা বলতাম, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাব দেব। এখন আমরা বলছি, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাবও দেব, আবার আক্রমণও চালাব।’

মোহেবি জানান, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ হয়েছে। তবে মোট কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা জানাননি তিনি।

আইআরজিসির এই মুখপাত্রের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এগুলোর পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।

মোহেবি আরও জানান, ইরানি বাহিনী ‘ফাদার অব অল বম্বস’ নামে একটি নতুন অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি শত্রুপক্ষের জন্য নতুন কিছু। তবে অস্ত্রটির ধরন, সক্ষমতা বা প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

হরমুজে জাহাজে হামলা, বাড়ছে তেলের দাম

ইরানের এ ঘোষণার মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজে হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলো অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের কাজে যুক্ত ছিল। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়।

আইআরজিসির দাবি, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনার স্বাধীন যাচাই সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের কারণে এ পথে জ্বালানি পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

গত মাসে বিকল্প পাইপলাইন ও অন্যান্য পথ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে সাম্প্রতিক হামলা আবারও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে সংঘর্ষও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এর জেরে সৌদি আরবেও হামলা চালাচ্ছে হুতিরা বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এসব ঘটনার প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

কেন সামরিক নীতি বদলাচ্ছে ইরান

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সামরিক নীতির মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বোঝাতে চাইছে, ভবিষ্যতে দেশটিতে হামলা চালালে তার জন্য বড় মূল্য দিতে হবে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল-জাজিরাকে বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে তেহরান। আগে হামলার জবাবে পাল্টা আঘাতের নীতি অনুসরণ করেও শত্রুপক্ষের ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে পারেনি ইরান।

মোর্তাজাভির মতে, তেহরান এখন নতুন একটি সমীকরণ তৈরি করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে ইরানে যেকোনো হামলার জন্য হামলাকারীদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়।

প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয় ইরান। তাই দেশটি ক্রমে অসমতাভিত্তিক যুদ্ধকৌশলের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক। এ ধরনের কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রভাব কাজে লাগানো হতে পারে।

মোর্তাজাভি বলেন, তেহরানের লক্ষ্য ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখেও এ চাপের প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সামরিক হুমকি ও সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও কূটনৈতিক উদ্যোগের ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সিদ্ধান্তই পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক-এর আরও খবর