আজই ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকি নিয়ে ইসরায়েলের সতর্কবার্তা

সেন্টকমের হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত, ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষা; ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     04-11-2026    33
আজই ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকি নিয়ে ইসরায়েলের সতর্কবার্তা

ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কমান্ড সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) পক্ষ থেকে বুধবারই হামলার পরিকল্পনা তৈরি রাখা হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন এখনো মেলেনি। এর মধ্যেই ইরান ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র যুক্ত করার প্রযুক্তি উন্নত করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে ইসরায়েল। যদিও ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গুরুত্ব নিয়ে মার্কিন ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরদিনই ইরানে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, সেন্টকমের হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা সামরিক হামলার পরিবর্তে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা সম্ভব। অন্যদিকে, কয়েকজন কর্মকর্তার যুক্তি, দেশটির শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে সামরিক পদক্ষেপই কার্যকর হতে পারে।

ইরানের রাসায়নিক অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের সতর্কতা

ইসরায়েলি গোয়েন্দারা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, ইরান দ্রুত এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র যুক্ত করা সম্ভব হবে। এমনকি অন্য দেশে রাসায়নিক অস্ত্র পাচার করে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জনেরও চেষ্টা করছে তেহরান। গত দুই সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকিকে বেশি জরুরি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে এ তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলেও অন্যরা ইসরায়েলি সরকারের এই সতর্কবার্তাকে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করছে কি না, তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মহলে বড় ধরনের মতভেদ নেই। মূল বিতর্ক হলো, ইরানের নেতারা এসব অস্ত্র বাস্তবে ব্যবহার করবেন কি না, বিশেষ করে দেশটির ওপর নতুন করে হামলা না হলে।

ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কিছু গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করেছে। তবে কয়েকটি দেশ ইরানের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাদের ধারণা, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আরও তীব্র পর্যায়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের রাসায়নিক অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে কিছু মূল্যায়ন জানিয়েছে, কিন্তু এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। এ কারণে কয়েকটি উপসাগরীয় সরকার এসব দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ইসরায়েলের সতর্কবার্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে ২০০২ সালে ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে দেওয়া ভুল গোয়েন্দা তথ্যের স্মৃতিও ফিরে এসেছে। সে সময় ইরাকের কাছে এ ধরনের অস্ত্র রয়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিল। পরে দেখা যায়, দেশটি তাদের পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচি অনেকটাই বন্ধ বা স্থগিত করেছিল।

রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত

ইরানের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র যুক্ত করা তুলনামূলক সহজ হলেও রাসায়নিক উপাদান কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সীমান্ত পেরিয়ে বোমা পাচার করাও সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল রাসায়নিক হামলার আশঙ্কার কথা জানালেও দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ডের চলমান সামরিক মহড়ায় এ ধরনের হামলা মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এ ধরনের হামলা থেকে সুরক্ষার নির্দেশনা নিয়েও সেনা কর্মকর্তা বা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়নি। এ বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টাও চলছে

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টাও চলছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এমন একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমাধান এবং নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর পথ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এখনো বড় ধরনের হামলার অনুমোদন দেননি।

ইরান রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, এ ধরনের অভিযোগ ইসরায়েলের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ। ২০০৩ সালে ইরান স্বীকার করেছিল, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তারা রাসায়নিক অস্ত্রের সক্ষমতা তৈরি করেছিল। তবে পরে তা ভেঙে ফেলার দাবি করে দেশটি।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি হুমকি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস নিউইয়র্ক টাইমসের প্রশ্নের জবাব না দিলেও একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রক্ষা করবেন ট্রাম্প।

সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট ও টাইমস অব ইসরায়েল।

আন্তর্জাতিক-এর আরও খবর